বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) নিজস্ব অর্থায়নে কেনা দুটি অত্যাধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজের প্রথমটি ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসসির বহরে যুক্ত হয়েছে। অপর জাহাজ ‘এমভি বাংলার নবযাত্রা’ আগামী ডিসেম্বরে বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) চীনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জিনজিয়াং নানইয়াং শিপইয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাহাজটি বিএসসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি।
এর আগে, গত ২১ সেপ্টেম্বর বিএসসি ও হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসির মধ্যে দুটি আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পূর্বে ১২ আগস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়–সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় জাহাজ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন পায়।
প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা ৬৩,৫০০ ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি)। দুটি জাহাজের মোট মূল্য ৭৬.৬৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা), যা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় ৪.৬০ শতাংশ কম।
জাহাজ কেনার জন্য গত ৪ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা ১৫ জুলাই পর্যন্ত বিক্রি হয়। ১৬ জুলাই জমা পড়া প্রস্তাবগুলো যাচাই–বাছাই শেষে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন এবং সরেজমিন পরিদর্শন সম্পন্ন করা হয়। মোট ৮টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করলেও, প্রস্তাব জমা দেয় ৩টি। মূল্যায়ন শেষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি–এর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। তাদের প্রস্তাবিত চীনে নির্মিত প্রতিটি জাহাজের মূল্য নির্ধারিত হয় ৩৮.৩৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্রয় প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তিনটি উপ–কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সেগুলো হলো— বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পিএইউ) এর নেতৃত্বে দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেকের সভাপতিত্বে ৭ সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি এবং নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) এর নেতৃত্বে কারিগরি সাব–কমিটি।
জাহাজগুলোতে রয়েছে উন্নত কারিগরি বৈশিষ্ট্য, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— কন্ট্রা রোটেটিং প্রপেলার যা জ্বালানি খরচ কমায় ও অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ায়। এরোডাইনামিক ব্রিজ ডিজাইন যা বাতাসের বাধা কমিয়ে গতি ও জ্বালানি সাশ্রয় করে। আধুনিক হাল ফর্ম ও নো বুলবুস বো যা গতি বৃদ্ধি ও জ্বালানি সাশ্রয় করে। এছাড়াও সিলেক্টিভ ক্যাটালিটিক রিডাকশন সিস্টেম নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ রক্ষা করে। গ্রিন শিপ কনসেপ্ট জাহাজগুলোকে পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে। তাছাড়াও আইএমও টিয়ার-III সার্টিফাইড ইঞ্জিন যা আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করে। এছাড়াও ইউরোপীয় ও জাপানি যন্ত্রপাতি দিয়ে জাহাজগুলো নির্মিত হয়েছে। প্রধান ইঞ্জিন জার্মান লাইসেন্সে তৈরি ম্যান-বি&ডব্লিউ, পাম্প স্পেনের এবং কম্প্রেসার নরওয়ের তৈরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর জাহাজগুলোর নাম পরিবর্তন করে ‘এক্সসিএল জেমিনি’ থেকে ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ এবং ‘এক্সসিএল লায়ন’ থেকে ‘এমভি বাংলার নবযাত্রা’ করা হয়।
নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়ার আগে বিএসসির বহরে পাঁচটি জাহাজ ছিলো। এর মধ্যে তিনটি অয়েল ট্যাংকার এবং দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, “নতুন দুটি আধুনিক বাল্ক ক্যারিয়ার যুক্ত হলে বিএসসির বহরের পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া জাহাজ দুটির মাধ্যমে প্রতি বছর ১৫০ জন নাবিকের কর্মসংস্থান হবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাহাজটি ২৬ অথবা ২৭ অক্টোবর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করবে। নিজস্ব অর্থায়নে জাহাজ ক্রয়ের এ উদ্যোগ দেশের সমুদ্রবাণিজ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করেন তিনি।
চীনে আয়োজিত জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। এ সময় বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) ইঞ্জি. মোহাম্মদ ইউসুফ, সচিব আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ শাহে দুল ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) ক্যাপ্টেন জামাল হোসেন তালুকদার এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সাইফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জাহাজ হস্তান্তর উপলক্ষে স্মারক চাবি জাহাজের মাস্টারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি, বায়ার সুপারভাইজার, জাহাজের মাস্টার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, নাবিকবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।