নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) সরকারকে ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার একটি চেক হস্তান্তর করতে যাচ্ছে। ৬টি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পের ঋণ কিস্তি এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ঘোষিত লভ্যাংশ বাবদ এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চেকটি তুলে দেওয়া হবে।
বিএসসি সূত্র জানায়, জি-টু-জি ভিত্তিতে ৬টি নতুন জাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে ‘৩টি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার ও ৩টি বাল্ক ক্যারিয়ার’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) ও চীন সরকার (চায়না এক্সিম ব্যাংক)-এর মধ্যে একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য গৃহীত ঋণের মূল পরিমাণ ছিল ১,১৯৯,৯৯৯,০৭০ ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পরে এই ঋণ পরিশোধের কাঠামো নির্ধারণে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সরকারের অর্থ বিভাগ ও বিএসসির মধ্যে একটি সাবসিডিয়ারি লোন এগ্রিমেন্ট (এসএলএ) স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, মোট ২ হাজার ৪২৫ কোটি ২ লাখ টাকা ১৩ বছরের মধ্যে সরকারকে পরিশোধ করবে বিএসসি।
এর আগে, গ্রেস পিরিয়ডকালীন সুদ বাবদ ৪৭৫ কোটি ২৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৪০ টাকার একটি চেক গত বছরের ২৬ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। সর্বশেষ কিস্তি ও ঘোষিত লভ্যাংশ মিলিয়ে এবার দেওয়া হচ্ছে আরও ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, বিএসসি বর্তমানে শুধু একটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং দেশের সামুদ্রিক পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ঋণ পরিশোধ এবং সরকারকে লভ্যাংশ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির একটি উদাহরণ তৈরি করতে চাই। নতুন জাহাজ সংযোজনের ফলে আমাদের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বহর সম্প্রসারণ, অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের নৌপরিবহন খাত আরও শক্তিশালী হবে।
দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিএসসির বহরে ৬টি নতুন বাণিজ্যিক জাহাজ যুক্ত হয়। বর্তমানে এর মধ্যে ৫টি জাহাজ—এমভি বাংলার জয়যাত্রা, এমভি বাংলার অর্জন, এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা, এমটি বাংলার অগ্রদূত এবং এমটি বাংলার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক রুটে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এসব জাহাজ বাংলাদেশের পতাকা বহন করে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যে অংশ নিচ্ছে।
বিএসসি কর্মকর্তারা জানান, নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির আয় ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করে ৩০৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছে সংস্থাটি, যা প্রতিষ্ঠানটির ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় নতুন জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম জাহাজ ‘বাংলার প্রগতি’ গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ডেলিভারি নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ডেলিভারি পাওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং নিজস্ব অর্থায়নে একটি আল্ট্রাম্যাক্স বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি চীন থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে আরও চারটি বড় আকারের জাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।