দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) ৫২ বছরের ইতিহাসে গত অর্থবছরেই সর্বোচ্চ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি এবার নিজ খরচে দুটি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কর্পোরেশন।
রবিবার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের বোট ক্লাবে ৪৭তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।
শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, 'বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্পোরেশনের ব্যবসা বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নতুন নতুন গন্তব্যে জাহাজ পরিচালনাসহ নানামুখী উদ্যোগের প্রেক্ষিতে শিপিং কর্পোরেশনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।'
তিনি বলেন, ‘সরকারের সহযোগিতা ও সক্রিয় দিকনির্দেশনার ফলে সংস্থাটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, 'বিগত সময়ে যা হয়নি, তা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছি আমরা। সরকারি অর্থায়নে জাহাজ কিনলেও এবার নিজেদের অর্থায়নে জাহাজ কিনবে শিপিং কর্পোরেশন, যা প্রতিষ্ঠানটির নিজের সক্ষমতার বড় উদহারণ। নতুন জাহাজ যুক্ত হলে জাহাজের বহর বাড়বে, পাশাপাশি ব্যবসারও উন্নয়ন হবে।'
কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএসসির পরিচালনা বাবদ ৪৮৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এতে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৫৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকায়।’
‘অন্যদিকে পরিচালনা ব্যয় ছিল ১৮৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে ব্যয় হয় ১২১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। যা সর্বমোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩১১ কোটি ৬০ টাকায়। ফলে নিট মুনাফার ভিত্তিতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সুপারিশ করে পরিচালনা পর্ষদ।’-বলেন তিনি।
কমডোর মাহমুদুল আরও বলেন, ‘চলতি বছরের ৩০ জুন বিএসসির পরিশোধিত মূলধন ছিল ১৫২.৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের শেয়ার ৭৯.৪৬ কোটি টাকা (৫২.১০ শতাংশ) এবং বেসরকারি শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার ৭৩.০৭ কোটি টাকা (৪৭.৯০ শতাংশ)। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বিএসসির মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩,৮১১.৫৩ কোটি টাকা, যার বিপরীতে বহিঃদেনা ২,২৫৬.১৬ কোটি টাকা।’
শেয়ারবাজার থেকে অর্থ ব্যবহার প্রসঙ্গে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আরপিও (রিপিট পাবলিক অফার) এর মাধ্যমে সংগৃহীত ৩১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার মধ্যে ৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ২৫ তলা ভবন নির্মাণে ৫৯ কোটি ৩৫ লাখ, শেয়ার বাজারজাতকরণে ১৭ কোটি ৯৩ লাখ এবং ছয়টি জাহাজ ক্রয়ে ১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।’
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারের সহযোগিতায় বিএসসি ইতোমধ্যে ছয়টি নতুন জাহাজ সংযোজন করেছে, যার মধ্যে পাঁচটি বর্তমানে বহরে রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংকার ও দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’
‘বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এবং শীঘ্রই ১২টি নতুন কন্টেইনার জাহাজ সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় ছয়টি নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন’— বলেন কমডোর মাহমুদুল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ।
মুনাফা বাড়ার প্রধান কারণ
আর্থিক প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিপিং কর্পোরেশনের মুনাফা ছিল মাত্র ১৭ কোটি টাকা। ছয় বছরের মধ্যে মুনাফা প্রায় ১,৩৭০ শতাংশ বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে কর্পোরেশনের মুনাফা বেড়ে ৭২ কোটি টাকায় পৌঁছালেও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১২ শতাংশ বেড়ে পেয়ে ২২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
শিপিং কর্পোরেশনের এই মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা—পণ্য পরিবহনের জন্য শিপি রেট বৃদ্ধি, বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ ভেসেলস (প্রটেকশন) (সংশোধনী) আইন বাস্তবায়ন, এফডিআরে সুদের হার বাড়ানো এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয় ও মুনাফা ক্রমাগত বাড়ছে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্রেইট রেট বেড়ে গেছে, যার ফলে কর্পোরেশনের মুনাফা অনেকটা বেড়েছে। এছাড়াও ফ্ল্যাগ ভেসেল আইন কার্যকর করায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন, এখন শিপিং কর্পোরেশনের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করছে।
'ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাজস্ব আয় ও মুনাফাও বাড়ছে। শিপিং কর্পোরেশনের জাহাজ ভাড়ার হার ডলারে নির্ধারিত হয়। আগে ডলারের দাম ৮২ থেকে ৮৬ টাকার মধ্যে ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে বড় মুনাফা হচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।