চায়ের দোকানে আড্ডায় ব্যস্ত আপনি আর আপনার আরেক বন্ধু। দুজনেই চায়ে চুমুক দিতে দিতে ফেসবুকে স্ক্রোল করছিলেন। হঠাৎ একটি রাজনৈতিক পোস্ট চোখে পড়ল, যেটি আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে না। তবে আপনার বন্ধুর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে। এরপর দু’জনের মধ্যে ছোট্ট তর্ক শুরু হলো। আপনি আপনার জায়গায় অনড়, আপনার বন্ধুও তাঁর নিজের বিশ্বাসে মজবুত অটল।
এই ছোট গল্প আমাদের দেখায়, আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ কেন একপক্ষীয় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। সেই রাজনৈতিক পোস্টের সত্যতার বিষয়টি একপাশে রাখা যায়। আলোচনা করা যাক, কেন আপনারা দুজন নিজের বিশ্বাসের বাইরে আর কিছুই বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না। এখানে মোটামুটি মানুষের মনস্তত্ত্বে কয়েকটি বিষয় কাজ করে, যেগুলোর কারণে সত্য-মিথ্যার বাইরে মানুষ নিজের জানা, নিজের বিশ্বাস ও নিজের যুক্তিতে অনড় থাকে।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতামত প্রকাশ, তথ্য আদান–প্রদান এবং রাজনৈতিক আলোচনা–বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, টুইটার বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন অসংখ্য রাজনৈতিক মতামত ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। দেখা যায়, এসব আলোচনায় অনেক ব্যবহারকারী নিরপেক্ষ বা বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করে একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সমর্থন করে একপাক্ষিক অবস্থান নেন। এই প্রবণতা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে বিভাজন তৈরি করতে পারে।
মানুষের মনস্তত্ত্ব এই একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণের একটি প্রধান কারণ। পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনের ভাষায়, মানুষ স্বাভাবিকভাবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে যা তাদের পূর্বের বিশ্বাস, মূল্যবোধ বা মতের সঙ্গে মিলে। এর ফলে তারা নতুন তথ্যের মধ্যে এমন অংশই দেখার চেষ্টা করে যা তাদের আগে থেকে ধার্য ধারণার সাথে মানায় এবং যেটার বিরোধিতা করে তা উপেক্ষা করতে পারে।
আগে থেকেই কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুরাগী ব্যক্তি সেই মতাদর্শের সহায়ক তথ্য সহজে গ্রহণ করেন এবং বিপরীত মত উপেক্ষা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ প্রবণতাকে আরও তীব্র করে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বলা হয়। এটি রাজনৈতিক আলোচনা, মিডিয়া গ্রহণ, ভোটদানের সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক বিতর্কে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ভোটার সেই খবর বেশি বিশ্বাস করবেন, যা তার সমর্থিত দলের পক্ষে বা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে।
বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিগত কাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে তার সামনে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার উপস্থাপন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারী যেসব পোস্টে বেশি প্রতিক্রিয়া দেন, অ্যালগরিদম সেই ধরনের পোস্ট আরও বেশি দেখায়। ফলে ব্যবহারকারীরা একটি সীমিত মতামতের পরিবেশে অবস্থান করতে থাকেন। যাকে অনেক গবেষক ‘ইকো চেম্বার’ বলে অভিহিত করেন।
ইকো চেম্বার হলো একটি সামাজিক বা মিডিয়ার পরিবেশ যেখানে মানুষ শুধুমাত্র তাদের নিজস্ব মতামত বা বিশ্বাসের সঙ্গে মিল থাকা তথ্যই পান, এবং বিরোধী মতের খবর বা তথ্য কমই শুনতে বা দেখতে পান। ফলে মানুষের ধারণা আরও দৃঢ় হয় এবং তারা সহজে নিজের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) ইত্যাদি প্রায়ই ইকো চেম্বার তৈরি করে, কারণ অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগ্রহের তথ্যই বেশি দেখায়।
সামাজিক পরিচয় ও দলগত প্রভাবও রাজনৈতিক পক্ষপাত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক মতামত ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতেও দেখা যায়। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের অধিকাংশ যদি কোনো একটি রাজনৈতিক মতাদর্শকে সমর্থন করেন, তাহলে অন্য সদস্যরাও অনেক সময় সেই মতাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। এতে ব্যক্তি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে পারেন এবং বিরোধ বা সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগনির্ভর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও মানুষের একপাক্ষিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে। রাগ, ভয় বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন পোস্ট সাধারণত বেশি শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া পায়। রাজনৈতিক বিষয়গুলো যখন আবেগঘন ভাষায় উপস্থাপিত হয়, তখন অনেক ব্যবহারকারী যুক্তির চেয়ে আবেগের ভিত্তিতে দ্রুত কোনো একটি পক্ষকে সমর্থন করতে শুরু করেন।
তথ্য বিভ্রান্তি বা ভুয়া তথ্যের উপস্থিতিও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্যবহারকারীরা এসব তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে পক্ষপাতমূলক মনোভাবকে আরও দৃঢ় করে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি মতের বৈচিত্র্য, গণতান্ত্রিক আলোচনা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা চর্চা করা। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক পক্ষপাত একটি জটিল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। মানুষের মানসিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অ্যালগরিদম, সামাজিক চাপ এবং তথ্যের অপব্যবহার—সবকিছু মিলেই এই প্রবণতা তৈরি হয়। তবে সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একটি গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।