চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানকে বদলি করে নৌবাহিনীতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দিয়েছে সরকার। ১৬ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত এই আদেশে একই সঙ্গে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির বর্তমান উপাচার্য রিয়ার অ্যাডমিরাল ড. খন্দকার আক্তার হোসেনকে নতুন চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মজার বিষয়, এই আদেশ যখন জারি হয়, তখন মনিরুজ্জামান নিজেই ছিলেন মোংলায়, সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কর্মসূচিতে। তিনি তখনো বন্দরে ফেরেননি, বিষয়টি জানতেন না তাঁর অধস্তন কর্মকর্তারাও।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নৌবাহিনী থেকে মনিরুজ্জামানকে ফেরত নেওয়ার আদেশ প্রথমে আসে ১২ আগস্ট। এরপর ১৩ আগস্ট তা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠানো হয়, এবং সেই আদেশেই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে রিয়ার অ্যাডমিরাল খন্দকার আক্তার হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় ১৬ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের জন্য নাম প্রস্তাব করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়।
এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকেই আসবে, তখনই বিস্তারিত জানা যাবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের মধ্যেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের আদেশ নৌ মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দেখা যায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই রিয়ার অ্যাডমিরাল খন্দকার আক্তার হোসেনকে প্রেষণে নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পদ হিসেবে ‘চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম’ এবং নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে ‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়’ উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে আক্তার হোসেনের পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে—এর আগে তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে সময় বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০২৪ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। দুই বছরের বেশি সময় দায়িত্বে থাকাকালে তিনি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হন নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার তৎপরতা নিয়ে। বন্দর ব্যবহারকারী ও বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন-ধর্মঘট উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়া চূড়ান্ত করেন, যার জেরে প্রায় তিন দিন দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর অচল ছিল। ২০০৯ সালের পর কোনো চেয়ারম্যানের আমলে বন্দর অচলের এমন ঘটনা এটিই প্রথম।
তাঁর সময়ে এনসিটির পাশাপাশি চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনালও (সিসিটি) বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলে। ডিপিএম পদ্ধতিতে প্রচুর প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বন্দর শ্রমিকরা এবং তাঁর মেয়াদে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা ছিলেন তটস্থ। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির অভিযোগ করেন, বন্দরকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া রুখতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও জেলে ঢোকানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সাবেক এই চেয়ারম্যান। নতুন চেয়ারম্যানের কাছে তিনি প্রত্যাশা করেন, বিদেশিদের কাছে বন্দর দেওয়া রুখতে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ যেন না নেওয়া হয় এবং পূর্বের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চীন থেকে ছয়টি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়ায় একই মূল্যে মাত্র চারটি জাহাজ ক্রয়ের মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৪৮৩ থেকে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বর্তমানে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া তাঁর বন্দর চেয়ারম্যান থাকাকালেই বন্দর থেকে আড়াইশ পণ্যভর্তি কনটেইনার গায়েবের ঘটনা ঘটে, যার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।