চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের নাম শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক সম্রাট শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৭। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ মোট ৪২টি মামলা রয়েছে।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে নগরের বহদ্দারহাট এলাকার ফিনলে সাউথ সিটি শপিং মলের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার মো. মিজানুর রহমান জানান, বুইস্যাকে গ্রেপ্তারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি চলছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক সম্রাট শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা মোটরসাইকেলযোগে ফিনলে সাউথ সিটি শপিং মল এলাকায় আসছেন। সে অনুযায়ী সেখানে অবস্থান নেয় র্যাবের একটি চৌকস আভিযানিক দল।
তিনি বলেন, র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে বুইস্যা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাকে ধরতে গেলে তিনি ধস্তাধস্তি করেন এবং তার কাছে থাকা অস্ত্র বের করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আভিযানিক দলের সদস্যরা তাকে নিরস্ত্র করার সময় তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের সময় বুইস্যার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
কে এই বুইস্যা?
শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যার বাড়ি ভোলার দৌলতখান থানায়। তিনি মোহাম্মদ আলীর ছেলে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম ষোলোশহর এলাকায় বসবাস করতেন। শিক্ষাজীবনে প্রাথমিকের গণ্ডিও পেরোতে পারেননি তিনি।
অপরাধজীবনের শুরুতে তিনি চুরি ও ছিনতাই করতেন। পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে হাতে তুলে নেন আগ্নেয়াস্ত্র। কিশোর গ্যাং গড়ে তুলে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি প্রায় ৩০ জনের একটি নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন।
চাঁদা আদায় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারে কথায় কথায় প্রকাশ্যে গুলি ছোড়া ছিল তার বাহিনীর নিত্যদিনের ঘটনা। বহদ্দারহাট এলাকায় তিনি একটি ‘টর্চার সেল’ও গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ এলাকার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের নাম ছিল এই সন্ত্রাসী বুইস্যা।
অস্ত্রের ভিডিও ও ধারাবাহিক অভিযান
গত ৪ অক্টোবর বুইস্যার সহযোগী মুন্না পাঁচলাইশের বাদুরতলা এলাকায় একটি গ্যারেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়েন। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিজয় চৌধুরীর গ্যারেজের সামনে এসে হুমকি দেওয়ার একপর্যায়ে কোমর থেকে পিস্তল বের করে গুলি করেন তিনি।
এর পর ৯ অক্টোবর চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ এলাকায় যৌথ অভিযানে পুলিশ বুইস্যা বাহিনীর তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদক উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি নগদ টাকা, ড্রোন, ওয়াকিটকি ও টাকা গণনার মেশিন জব্দ করা হয়। অভিযানের খবর পেয়ে বুইস্যাসহ তার অন্যান্য সহযোগীরা পালিয়ে যান।
ওই অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৫টি বিদেশি পিস্তল, ৩টি বিদেশি বন্দুক, ২টি দেশীয় পাইপগান, ১টি শর্ট শুটার গান, ২টি দেশীয় লম্বা বন্দুক, ১৩টি ম্যাগাজিন ও ৫৮টি গুলি।
এর আগে ২১ জুলাই বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকার একটি ভবনের তৃতীয় তলায় বুইস্যার কথিত ‘টর্চার সেল’ শনাক্ত করে পুলিশ। সেখানে অভিযান চালিয়ে তার ১১ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় দেশীয় অস্ত্র, গুলি ও গুলির খোসা—যার মধ্যে থানা থেকে লুট হওয়া গুলিও ছিল।
এরও আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর চান্দগাঁও থানার পাশের একটি মোটরগ্যারেজে চাঁদা না পেয়ে স্বয়ং বুইস্যা গুলি করেন। একই বছরের ১৯ অক্টোবর তিনি ও তার সহযোগীরা মনিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করেন।
২০২৩ সালের ২৩ মে কালুরঘাট এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হলেও তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন বুইস্যা। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।