চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অনন্যা আবাসিক এলাকার প্লট বরাদ্দে ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিমালা লঙ্ঘন ও জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্লট বরাদ্দের নথি অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, চউকের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং চউকের তৎকালীন প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস গণি চৌধুরী যোগসাজশে প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। বোর্ড সদস্য হিসেবে ইউনুস গণি চৌধুরীর সরাসরি নিজের নামে প্লট নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকায় তিনি আশরাফুল আমিনের মাধ্যমে চউকের প্লট নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, একই কৌশলে বোর্ড সদস্য ইউনুস গণি আরও সাত থেকে আটটি প্লট হাতিয়ে নিয়েছেন।
‘বিশেষ বিবেচনা’ নামে বিধি লঙ্ঘন
২০০৮ সালে অনুমোদিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের মূল নীতিমালায় ‘বিশেষ বিবেচনা’ নামে কোনো কোটা না থাকলেও ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর চউকের ৪০৫তম বোর্ড সভায় বিধিবহির্ভূতভাবে এই নতুন কোটা যুক্ত করা হয়। এই কোটায় প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতা ও দলের অনুগত সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে।
এই কোটাতেই প্লট বাগিয়ে নেন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও অন্যান্য ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ’। পিছিয়ে ছিলেন না চউকের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনও। তিনিও বিশেষ কোটায় বাগিয়ে নেন প্রায় চার কাঠার একটি প্লট। তাকে বিশেষ এই সুবিধা দেন চউকের তৎকালীন প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস গণি চৌধুরী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫৯ জন আবেদনকারীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংসদ সদস্য ডা. মো. আফছারুল আমীনসহ একাধিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। সেই তালিকার ৫২তম আবেদনকারী মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। তিনি ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর প্লট বরাদ্দ পান। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও নিজেকে 'জেনুইন এবং ডিজার্ভিং' ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ বিবেচনায় প্লট বাগিয়ে নেন তিনি।
বিধিবহির্ভূতভাবে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া গোপন বরাদ্দ
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) আবাসিক প্লট বরাদ্দ প্রবিধানমালা, ১৯৯৮-এর ৫ ধারা অনুযায়ী কোনো প্লট বরাদ্দের আগে কমপক্ষে চারটি বহুল প্রচারিত জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৪০৫তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, “উচ্চপদস্থ ব্যক্তি” ও “প্লট কম” হওয়ায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যার ফলে উন্মুক্ত আবেদন বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন হয়।
গোপনীয় এই কারবারের মধ্যেই মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের নামে অনন্যা আবাসিক এলাকার ৩ দশমিক ৮০ কাঠার (ডি ৩১৪এ নম্বর) কোটি টাকা মূল্যের প্লটটিও ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর বরাদ্দ দেয়া হয়। সাধারণ জনগণের প্লট প্রাপ্তির অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজের জন্য প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করেন তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল আমিন।
কৌশলে প্লট বাগিয়ে চক্রের কাছে বিক্রি
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু প্লট বাগিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হননি আশরাফুল আমিন। কৌশলে জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য ইউনুস গণি চৌধুরীর প্লট বাণিজ্য চক্রে। ইউনুস গণি চৌধুরী একইসাথে প্লট বরাদ্দ কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব থাকায় যোগসাজসে মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের নামে প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করেন।
পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আশরাফুল আমিন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে প্লট রেজিস্ট্রির জন্য আবেদন করেন। এরপর ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল লিজ ডিড এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন করেন। এখানেই শেষ নয়, মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ১৬ জুন ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রী জাকিয়া বেগমের নামে প্লট হস্তান্তরের আবেদন করেন আশরাফুল আমিন।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট হস্তান্তরের পর চূড়ান্তভাবে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। ঘুরেফিরে স্ত্রী জাকিয়া বেগমের হাতধরে সেই প্লটটিই চলে যায় ইউনুস গণি চৌধুরীর কব্জায়। কৌশলে প্লট বাগানোর এই পুরো প্রক্রিয়ায় মাষ্টারমাইন্ডের ভূমিকায় ছিলেন চতুর আশরাফুল আমিন।
জানা গেছে, কোটি টাকারও বেশি দামের প্লট হস্তান্তরের বিনিময়ে তিনিও পেয়েছেন অন্তত অর্ধকোটি টাকা। বরাদ্দের নথিপত্র ঘেটে দেখা যায় মাত্র ১২০ দিনের মধ্যে লিজ গ্রহণ এবং হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ করেন আশরাফুল আমিন।
হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়ে প্লট বাগিয়ে নেন ‘বিসিএস ক্যাডার’ আশরাফুল
প্লট বরাদ্দ নিতে জমা দেয়া হলফনামায় মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন ঘোষণা দেন, চট্টগ্রাম শহরে তার বা তার পরিবারের নামে কোনো প্লট নেই এবং বরাদ্দকৃত প্লটটি তিনি নিজ আবাসিক প্রয়োজনে ব্যবহার করবেন। কিন্তু লিজ গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্লটটি তিনি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রী জাকিয়া বেগমের কাছে হস্তান্তরের আবেদন করেন।
প্লট বরাদ্দ ও হস্তান্তরের মূল্য নিয়েও আছে গোজামিল। ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্মারক নং- ইও (এল)/প্লট বরাদ্দ/অনন্যা বিবিধ/২২/১০৪) অনন্যা আবাসিক এলাকায় ৩ দশমিক ৮০ কাঠার ডি-৩১৪এ নম্বর প্লট বরাদ্দ পান বিশেষ কোটায় যার মূল্য ছিল মাত্র ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রায় তিন বছরের মধ্যে এবং লিজ গ্রহনের মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট প্লটটি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রীর কাছে ৩৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে (দলিল নং-২৭৬০) হস্তান্তর করেন।
৩ দশমিক ৮০ কাঠার প্লটটি মাত্র ৩৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় হস্তান্তর করলেও তখন ওই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ছিলো। সে অনুযায়ী আবাসিকের ঐ প্লটটির মূল্য কোটি টাকারও বেশি। গুঞ্জন আছে কাগজে কলমে ঘোষিত মূল্যের তুলনায় প্রকৃত লেনদেন অর্ধ কোটিরও বেশি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রদান এবং বরাদ্দকৃত প্লটকে আবাসিক ব্যবহারের পরিবর্তে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা—উভয়ই বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আশরাফুল আমিনের কাছ থেকে প্লট বুঝে নেয়ার পর জাকিয়া বেগম প্লটটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড সিডিএ এভিনিউ শাখার অনুকূলে বন্ধক রেখে বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) থেকে ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল ছাড়পত্র গ্রহণ করেন।
প্লট বরাদ্দের বিষয়ে আশরাফুল আমিনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্লট সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয়ে আশরাফুল আমিনের একটি ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া গেছে। সেখানে তিনি দাবি করেন, প্লটের যে মূল্য বা সারচার্জ এসেছিল তা অর্থের অভাবে তিনি দিতে পারেননি। তাই তিনি প্লট গ্রহণ করেননি কিংবা বুঝে নেননি। এবং পরবর্তীতে নীতিমালা মেনে হস্তান্তর করে দেন। তবে তিনি চউকে কর্মরত থাকাকালীন সরকারি কোটায় প্লট বরাদ্দ চেয়ে আবেদনের কথা স্বীকার করেন।
তবে ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী (দলিল নং-২৭৬০) ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট প্লটটি নিজ নামে বরাদ্দ থেকে ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেন এবং রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়।
প্লট বরাদ্দ নিয়ে একদিকে দুদকের অনুসন্ধান, অন্যদিকে হস্তান্তর
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) আলোচিত ‘অনন্যা’ আবাসন প্রকল্পে নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে প্লট সংখ্যা বৃদ্ধি, লটারির পরিবর্তে পছন্দসই ব্যক্তিদের মধ্যে প্লট বরাদ্দ এবং নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে আবেদনকারীদের বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। এ ঘটনায় একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া ৫৯টি প্লটের ফাইল দুদক জব্দ করে বলে জানা যায়। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট প্লটগুলো তখন তদন্তাধীন অবস্থায় ছিল এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও ছিলো।
তবে প্রশ্ন উঠেছে দুদকের তদন্ত চলমান থাকা এবং সংশ্লিষ্ট ফাইল জব্দ থাকার পরও আশরাফুল আমিন কীভাবে ২০১৬ সালে ওই প্লট হস্তান্তর করতে সক্ষম হন। তদন্তাধীন ও বিতর্কিত প্লট হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি বাধা তোয়াক্কা না করে প্রভাব খাটিয়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তিনি।
আইন লঙ্ঘনের সম্ভাব্য শাস্তি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, এই ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দণ্ডবিধি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রতারণা ও অসাধু উপায়ে সম্পদ বা সুবিধা গ্রহণের অপরাধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২০ ধারা, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের অনৈতিক কার্যকলাপ, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে, যার মধ্যে চাকরিচ্যুতি বা অন্যান্য প্রশাসনিক শাস্তি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
তবে অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত ও সত্যতা যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সমীচীন নয়।