চট্টগ্রাম মহানগরে অবৈধ ও ব্যতিক্রমী ভবন নির্মাণ যেন থামছেই না। নগর উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) কিছু ইমারত পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নকশা পরিবর্তন, সরু রাস্তা প্রশস্ত দেখানো, সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে উপস্থাপন, এমনকি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করেও ভবনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অথচ ভবন অনুমোদন থেকে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ইমারত পরিদর্শকদের একটি অংশই এসব অনিয়মের মূল সহায়ক হিসেবে অভিযুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি চউক। অভিযোগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তিন ইমারত পরিদর্শক—আবু জাফর ইকবাল, আব্দুর রশিদ ও বিমান বড়ুয়া।
সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানা দেখিয়ে ২০ তলা ভবনের অনুমোদন!
নগরের আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সাবেক অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দাল্লা মেডিকেলের পেছনে অবস্থিত “মুনতাসির বিল্ডিং লিমিটেড” এর নামে ভবনটির অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। অনুমোদনের স্মারক নম্বর—২৫.৪৭.১৫০০.০৭৩.৪৩.১৯১.২৩।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভবনটির জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ প্রবেশপথ (অ্যাকসেস রোড) না থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে দেখিয়ে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনাপত্তি বা অনুমতি ছাড়াই নকশা অনুমোদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক আবু জাফর ইকবাল পুরো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। অভিযোগ আছে, জমির মালিকানা, প্রবেশপথ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা অনিয়মগুলো উপেক্ষা করে অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেন। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ১৩ তলা ভবনের অনুমোদন!
নগরের দক্ষিণ কাট্টলী মৌজাতেও সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখিয়ে নুরুল মোস্তফা নামে এক ব্যক্তি সিডিএতে ভবনের নকশা অনুমোদনের আবেদন করেন। বিসি কেস নম্বর ৭২২/২০২০–২০২১ অনুযায়ী, খতিয়ান নং ৬০৭৬ ও বিএস দাগ নং ১২৭২০-এর মালিকানা যাচাইয়ের জন্য বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠানোর সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন ইমারত পরিদর্শক স্বপন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ইমারত পরিদর্শক মো. আবু জাফর ইকবাল ও তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াসের যোগসাজশে ভুয়া বি.এস খতিয়ান তৈরি করা হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করা ওই খতিয়ানে খতিয়ান নম্বর ১৪৭৯/১ এবং বিএস দাগ নম্বর ৬৮৪৩ ও ৬৮৪৪ উল্লেখ করা হয়। পরে সেই ভুয়া খতিয়ানের ভিত্তিতে বেইসমেন্টসহ ১৩ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় বিপুল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
একই প্লটে দুই ভবনের অনুমোদন, তদন্তে দুদক
নগরের চাঁদগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের ১৪ নম্বর সড়কের ৩৫১ নম্বর প্লট নিয়ে আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে। একই প্লটে দুই দফায় পৃথক ভবনের অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায় বর্তমানে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্লটের মালিক কাজী মাহবুব রহমান গং ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ ৯ তলা আবাসিক ভবনের অনুমোদন পান। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভবনটির ৯ তলার নির্মাণকাজ চলমান ছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণাধীন ভবনের তথ্য গোপন করে একই প্লটকে “খালি জায়গা” দেখিয়ে নতুন করে ১১ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়। এ কাজে সহযোগিতা করেন তৎকালীন অথরাইজড অফিসার মো. হাসান এবং ইমারত পরিদর্শক আব্দুর রশিদ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারির ইমারত পরিদর্শন প্রতিবেদনে (স্মারক নম্বর ২৫.৪৭.১৫০০.০৭২.৪৩.৫৯৬.২২) আব্দুর রশিদ উল্লেখ করেন, “উক্ত স্থানে কোনো ভবন নেই, জায়গাটি খালি।” অথচ সে সময় সেখানে দৃশ্যমানভাবে ৯ তলার নির্মাণকাজ চলছিল। এছাড়া পাশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জমির বিষয়টিও প্রতিবেদনে গোপন রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পায় দুদক। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বিমান ‘ম্যানেজ’ হলেই চলে অবৈধ নির্মাণ!
ইমারত পরিদর্শক বিমান বড়ুয়ার বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি নগরের জামালখান, মেহেদীবাগসহ কোতোয়ালি এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো ভবনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি তা গোপনে ভবন মালিককে জানিয়ে দেন। পরে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বিষয়টি “ম্যানেজ” করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া নগরের আসকার দীঘির পশ্চিমপাড় এলাকায় একটি ভবন কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই দুই তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হলেও এ বিষয়ে তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসকার দীঘির পূর্বপাড়ে শহীদুল করিম গং-এর পক্ষে আমমোক্তার হিসেবে নিয়োজিত সিপিডিএল প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট আর.এস দাগ নং ৪৫১ (অংশ), ৪৫১/১ (অংশ) এবং বি.এস দাগ নং ৮৭০ (অংশ), ৮৭১ (অংশ)-এ ভবন নির্মাণ শুরু করে। এ বিষয়ে মো. বেলাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি চউকে লিখিত অভিযোগ দাখিল করলে অথরাইজড অফিসার-২ সংশ্লিষ্ট স্থানে “ব্যতিক্রমী নির্মাণ অপসারণ ব্যতীত সকল কাজ বন্ধ রাখার” নির্দেশ দেন। তবে ‘কাজ বন্ধের নির্দেশ’ অমান্য করে নির্মাণকাজ অব্যাহত আছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশনার পরও একদিনের জন্যও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। বরং পুরো প্রক্রিয়ায় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করেছেন ইমারত পরিদর্শক বিমান বড়ুয়া। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যা বলছেন সিডিএ কর্মকর্তারা
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) অথরাইজড অফিসার কাজী কাদের নেওয়াজ ও তানজিব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে কোনো ভবন ইমারত আইন অনুযায়ী নির্মিত হচ্ছে কি না—তা পর্যবেক্ষণের মূল দায়িত্ব ইমারত পরিদর্শকদের ওপরই বর্তায়।
তারা বলেন, “ইমারত পরিদর্শকরা আমাদের যে তথ্য দেন, তার ভিত্তিতেই আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করি। যদি কোনো পরিদর্শক তথ্য গোপন করেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই তা তাৎক্ষণিকভাবে জানার সুযোগ থাকে না।”
কী আছে আইনে?
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী, ইমারত পরিদর্শকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। আইনের ধারা ৩-এ বলা আছে, পরিদর্শক বা কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত ব্যক্তি যে কোনো নির্মাণাধীন বা নির্মিত ভবন পরিদর্শন করতে পারবেন এবং নকশা লঙ্ঘন শনাক্ত করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একই আইনের ধারা ৩ক-এ নকশা বহির্ভূত নির্মাণ দেখা গেলে কাজ বন্ধের সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর ধারা ৫ অনুযায়ী আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮-এ পরিদর্শকদের দায়িত্ব আরও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিধি ১৩ অনুযায়ী ভবন নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে বাধ্যতামূলকভাবে পরিদর্শন ও তদারকি করতে হবে। বিধি ১৬-এ বলা হয়েছে, নকশা বিচ্যুতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক লিখিত প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক; তা না করলে তা ব্যক্তিগত দায়িত্বভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি বিধি ৮০-এ ভুল তথ্য দিয়ে নকশা অনুমোদন বা অবৈধ নির্মাণে সহায়তা করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা, লাইসেন্স বাতিল কিংবা ফৌজদারি মামলার বিধান রয়েছে।
এছাড়া, ঘুষ গ্রহণ, নথি জালিয়াতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা ৪৬৭ ও ৪৬৮ অনুযায়ী সরকারি নথি বা খতিয়ান জালিয়াতির শাস্তি সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একই আইনের ধারা ১৬১ ও ১৬৫-এ ঘুষ গ্রহণ বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিধান অনুযায়ী পরিদর্শন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, ঘুষ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন
একের পর এক অভিযোগ, দুদকের অভিযান এবং একাধিক তদন্ত চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ ভবন কেবল আইন লঙ্ঘন নয়। এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আর যদি এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই জড়িত থাকেন বা কার্যকর নজরদারি না থাকে, তবে পুরো নগর ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়—এমন মতও তাদের।