গত রবিবার (১৭ মে) থেকে চট্টগ্রামের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ। কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি।
রবিবার রাতেই এ ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেয় এনসিপি ও বিএনপি। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
পরদিন সোমবার সকালে ফের গ্রাফিতি আঁকতে মহানগরের টাইগার পাস মোড়ে জড়ো হন একদল তরুণ-তরুণী। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধ্বস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনায় এনসিপি নেতারা দায়ী করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে। এরপর থেকে বিষয়টি ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন এবং রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
শুধু গ্রাফিতি ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি আলোচনা। জুলাই আন্দোলনে কার কী অবদান ছিল—তা নিয়েও শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক। এর মধ্যেই এনসিপি নেতারা মেয়রের পদে থাকার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছেন।
এসবের বাইরে গিয়ে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পিলে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য।
প্রায় ৪ হাজার ৩শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) শহীদ ওয়াসিম সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ের (লালখান বাজার আমীন সেন্টার থেকে আগ্রাবাদ মোড় পর্যন্ত) নিচের অংশ সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে একটি বেসরকারি বিজ্ঞাপন সংস্থার সঙ্গে বিনা টেন্ডারে পাঁচ বছরের চুক্তি করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)।
চুক্তি অনুযায়ী, এই সময়ে লালখান বাজার (আমীন সেন্টার) থেকে আগ্রাবাদ মোড় পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের নিচের আইল্যান্ডে বৃক্ষরোপণ, নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন, নিয়মিত বৃক্ষ পরিচর্যা, পানি সেচ এবং সিটি কর্পোরেশনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজন হলে পুলিশ বক্স ও পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে ওই এলাকায় ৫৩টি উভয়মুখী লাইট প্যানাফ্লেক্স সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
যুবদল নেতার স্ত্রীর সঙ্গে চুক্তি
চসিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটির নাম জে এম পাবলিসিটি। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী নিহার সুলতানা, যিনি চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির স্ত্রী।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে জে এম পাবলিসিটির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত।
চুক্তির আওতায় শহীদ ওয়াসিম সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ের নিচে উভয়মুখী প্রায় ৫৩টি আলোকিত প্যানাফ্লেক্স এবং ৭টি আলোকিত টি-সাইনসহ মোট ৬০টি বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়।
এছাড়াও চুক্তির আওতায় নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একাধিক বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে টাইগারপাস মোড়ে বাংলাদেশ স্কাউটস ভবনের সামনে রাস্তার পাশে একটি প্যানাফ্লেক্স, জিইসি মোড়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ভবনের সামনে এবং গণপূর্ত আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখে রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে উভয়মুখী দুটি টি-সাইন স্থাপনের অনুমোদন রয়েছে।
গণপূর্ত আবাসিক এলাকার দেয়ালের সামনে ফুটপাতের পাশে একটি একমুখী প্যানাফ্লেক্স, স্টিলমিল-সিইপিজেড ওভারব্রিজ এলাকায় একটি উভয়মুখী প্যানাফ্লেক্স এবং জিইসি মোড়ের ওয়েল ফুড থেকে গোলপাহাড় মোড় পর্যন্ত মিড আইল্যান্ডে উভয়মুখী দুটি টি-সাইন স্থাপনের কথাও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া চকবাজার কেয়ারী মার্কেট ও বালি আর্কেড মার্কেটের সামনে রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে উভয়মুখী দুটি টি-সাইন এবং নিউ মার্কেট গোলচত্বর মুখে রাস্তার আইল্যান্ডে আরও দুটি উভয়মুখী টি-সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
নামমাত্র মূল্যে চুক্তির অভিযোগ
চুক্তিপত্রে মোট ৬০টি প্যানাফ্লেক্স ও টি-সাইন স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিজ্ঞাপন বোর্ডের মোট আয়তন ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭০০ বর্গফুট। আলোকিত প্রতি বর্গফুট বিজ্ঞাপনের জন্য ৩০০ টাকা হারে বছরে মোট ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বিজ্ঞাপন কর নির্ধারণ করে জে এম পাবলিসিটির সঙ্গে চুক্তি করে চসিক।
এছাড়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী, এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বাবদ ১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম ব্যস্ত ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিপুল সম্ভাবনাময় বিজ্ঞাপন স্পট থাকা সত্ত্বেও অস্বাভাবিক কম মূল্যে বিজ্ঞাপন কর নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই এ চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, লালখান বাজার থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের রুটে বিজ্ঞাপনের প্রকৃত বাজারমূল্য বছরে কোটি কোটি টাকা হলেও মূল চুক্তিতে বাৎসরিক বিজ্ঞাপন কর নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়া কিছু অতিরিক্ত স্পটের জন্য আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া জে এম পাবলিসিটিকে প্রথম বছরে ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বিজ্ঞাপন করের পাশাপাশি ভ্যাট ও আয়কর এককালীন অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শর্তে বলা হয়েছে, পরবর্তী প্রতিটি চুক্তি বছরের প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে মোট চুক্তি মূল্যের অর্ধেক অর্থাৎ ১৩ লাখ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই হবে। বাকি ১৩ লাখ ৫ হাজার টাকা পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।
হঠাৎ বাতিল চুক্তি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক বার্তায় জানান, জে এম পাবলিসিটির সঙ্গে করা চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, সিটি কর্পোরেশনের সব চুক্তি ও কার্যাদেশ মেয়রের অনুমোদন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। আইন কর্মকর্তার ভেটিং এবং মেয়রের অনুমোদনের পরই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করা হয়ে থাকে।
তবে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাতের নির্দেশনায় গত ৯ এপ্রিল চসিকের রাজস্ব বিভাগের এক আদেশের মাধ্যমে চুক্তিপত্রটি বাতিল করা হয়। ওই আদেশে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বাক্ষর করেন মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন।
চুক্তি বাতিলের পরও বিজ্ঞাপন খুজছে জে এম পাবলিসিটি
চুক্তি বাতিল হলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কার্যক্রম এখনো চালিয়ে যাচ্ছে জে এম পাবলিসিটি—এমন অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি এক্সপ্রেসওয়ের পিলারে বিজ্ঞাপন দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনটি মোবাইল নম্বরসহ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগের নম্বর হিসেবে ব্যবহৃত ০১৮১৯-৩০৫৮৭৮ নম্বরটি মো. রাশেদের এবং ০১৭২৯-৬৭১১১৪ নম্বরটি মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বাবলুর।
আরও জানা যায়, ০১৭২৯-৬৭১১১৪ নম্বরটি জে এম পাবলিসিটির স্বত্বাধিকারী নিহার সুলতানার নম্বর হিসেবেও বিভিন্ন আবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে।
চসিকের সঙ্গে জে এম পাবলিসিটির চুক্তিপত্রে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করা জিয়াউদ্দিন বাবলু ও রাশেদ—দুজনই সেখানে একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছেন।
এছাড়া জে এম পাবলিসিটির স্বত্বাধিকারী নিহার সুলতানা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যানের কাছে প্রকল্পের কাজ শুরু করার লক্ষ্যে একটি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) চেয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদনপত্রেও ০১৭২৯-৬৭১১১৪ নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে।