চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালী থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় অনুমোদিত নকশা অমান্য করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। সেই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেছে চউকের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
অভিযুক্তরা হলেন এক্সক্লুসিভ প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী (কৃষাণ) ও ভূমিমালিকগন। চউক জানিয়েছে, ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করা হয়েছে।
চউক সূত্রে জানা গেছে, রহমতগঞ্জ মৌজার আর.এস. ৩১(অ), ৩৩(অ), ৩৪ (অ), ৩৫(অ) এবং বি.এস. ১৪৯ (অ), ১৫১ (অ) দাগভুক্ত জমিতে নির্মাণাধীন 'মার্ক ডি সিলভা গং' এর একটি আবাসিক ভবনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, সেটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। পরে চউকের অথরাইজেশন বিভাগের ইমারত পরিদর্শক বিমান বড়ুয়া সরেজমিন পরিদর্শন করে ভবনের বিভিন্ন অংশে নকশার ব্যত্যয়ের প্রমাণ পান।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবনটির চারপাশে নির্ধারিত সেটব্যাক ও অন্যান্য কারিগরি শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার পরও সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
চউকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার ক্ষমতাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
আইন অনুযায়ী, আদালত দোষী সাব্যস্ত করলে নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। প্রয়োজন হলে চউক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অবৈধ অংশ উচ্ছেদ করবে এবং এর ব্যয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করা হবে।
এছাড়াও, আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর যদি অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা না হয় এবং অবৈধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়, তবে অপরাধ অব্যাহত থাকার সময়কালীন প্রতিদিনের জন্য আরও অতিরিক্ত অর্থদণ্ডের মুখে পড়তে হবে ভবন মালিক বা ডেভেলপারকে। ডেভেলপার কোম্পানির ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত হলে চউক উক্ত প্রতিষ্ঠানের ডেভেলপার লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের চট্টগ্রাম মহানগরীতে কালো তালিকাভুক্ত করতে পারে।
চউকের কর্মকর্তারা বলছেন, নগরে নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন। নগর পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার স্বার্থে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নগরে ভবন নির্মাণে যে কোনো প্রকার ব্যতিক্রমী বা অবৈধ কাজ করা হলে, আইন অমান্যকারীদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা ও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। এক্সক্লুসিভ প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড- এর বিরুদ্ধে করা এই মামলাটি চউকের সেই নিয়মিত এবং কঠোর মনিটরিংয়েরই অংশ।
রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে হাজার কোটি টাকার মালিক
অনুসন্ধানে জানা যায়, এক্সক্লুসিভ প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী (কৃষাণ) চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। ছিলেন চসিকের ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। সবশেষ আওয়ামী লীগের আমি-ডামির নির্বাচন খ্যাত ২০২৪ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী হাসান মাহমুদের ঘনিষ্ঠ ও আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত ছিলেন বিজয় কুমার চৌধুরী। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একজন কর্মকর্তা থেকে পরবর্তীতে আবাসন খাতে বড় উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং নাটকীয়ভাবে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী হাসান মাহমুদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ভবনগুলোতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল এবং নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছিলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রহমতগঞ্জের ভবনটির ক্ষেত্রেও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়ের বিষয়ে চউক প্রথমে নোটিশ দিলেও কার্যকর সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী বা এক্সক্লুসিভ প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।