রোড রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে সুইডেন যাচ্ছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সচিব এবং তিন প্রকৌশলী। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গত ৬ জুলাইয়ের এক আদেশে তাঁদের ২৫ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সুইডেন সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ভ্রমণ তালিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামান, চসিকের সচিব আশরাফুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুল ইসলাম এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা।
রোড রোলার সরবরাহের চার মাস পর কর্মকর্তাদের বিদেশে গিয়ে চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১১ মার্চ পাঁচটি রোলার চসিকের স্টকে যুক্ত হয়েছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী, রোলার সরবরাহের সাত দিনের মধ্যে চট্টগ্রামে সহকারী প্রকৌশলী ও চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল।
চসিকের জন্য পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোলার সরবরাহে ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ পায় মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। চুক্তিতে রোলার সরবরাহের পর প্রশিক্ষণের জন্য ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এই অর্থ বহন করার কথা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।
এদিকে, রোড রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হলেও রোলারগুলো এরই মধ্যে চসিকের স্টকে যুক্ত হয়েছে। ফলে সরবরাহের পর কর্মকর্তাদের বিদেশে গিয়ে এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর একই ধরনের বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত হওয়ায় সেটি কার্যকর হয়নি। ওই আদেশে চসিকের চার কর্মকর্তার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবদুর রহমানের নাম ছিল।
গত ৬ জুলাইয়ের নতুন আদেশে আবদুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নাম যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সফরের মেয়াদ সাত দিন থেকে বাড়িয়ে ১০ দিন করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, রোড রোলার চালানোর কাজ চালকদের এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কারিগরি কর্মীদের। তাহলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব, চসিকের সচিব এবং তিন প্রকৌশলীর বিদেশে গিয়ে এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
চসিকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করার নীতির কারণে সফরের ফাইলটি গোপন রাখা হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন জারির পরও সফর বাতিল বা স্থগিতের কোনো আদেশ প্রকাশিত হয়নি।
সফরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন জানান, ‘এই ভ্রমণে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। পরিকল্পনাও নেই। আগে ভ্রমণটিতে স্থগিতাদেশ ছিল। এখন অনেকে যাচ্ছে। যেমন: ওয়াসা, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই জন্য হয়তো স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে আবার ভ্রমণ অনুমোদন দিয়েছে।’
চসিকের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, ‘এই বিষয়ে আমাকে কেউ অবহিত করেনি। আমি খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
চসিকের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রোলার চালাবেন চালক আর মেরামত করবেন মেকানিক। প্রশিক্ষণে গেলে তাঁদের যাওয়ার কথা। কর্মকর্তাদের সেখানে কাজ কী? সরকারি কেনাকাটায় এ ধরনের ভ্রমণ অনেক সময় প্রমোদভ্রমণ হিসেবে রাখা হয়।’
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘যেখানে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বন্ধের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে রোড রোলার চালানো শিখতে মন্ত্রীর একান্ত সচিব, সিটি কর্পোরেশনের সচিব ও প্রকৌশলীদের সুইডেন যাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁরা কি দেশে ফিরে রোলার চালাবেন? ঠিকাদারের অর্থে এমন ভ্রমণ হলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে।’