চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও হামলাসহ একাধিক ঘটনায় আলোচনায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন ওরফে ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরেই ছিলেন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশীয় মুঠোফোন সিম ব্যবহার না করে বিদেশি নম্বর ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন তিনি। গ্রেপ্তার এড়াতে পরিবর্তন করতেন অবস্থান ও গাড়ি; এমনকি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত এক হত্যা মামলার তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া সহযোগীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশের একাধিক জেলায় চেকপোস্ট বসিয়ে তিন দফা চেষ্টা করেও তাঁকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পরে যশোর জেলা পুলিশের সহায়তায় ভোররাতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য অস্ত্র।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের এই বর্ণনা দেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদ চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর জেলা পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়। তদন্তে উঠে আসে ডেভিড ইমন ও তাঁর সহযোগীদের নাম।
এরপর গত ২২ জুলাই মাসুদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছকে ঢাকার ডিএমপি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াছ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এবং অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘তারা অত্যন্ত ধুরন্ধর। নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে এবং দেশীয় সিম ব্যবহার করে না। বিদেশি নম্বর ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলে।’
সম্প্রতি চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান এক্সাবাইট লিমিটেড ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএন (ডিজিটাল ডট নেট) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায়ও ডেভিড ইমন ও তাঁর নেটওয়ার্কের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই ঘটনার আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
পুলিশের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আলোচনায় আসার পর ডেভিড ইমন বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর পরামর্শে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। ঝিকরগাছা সীমান্ত দিয়ে তাঁকে ভারতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সীমান্তের ওপারে কে তাঁকে গ্রহণ করবে, সেটিও ঠিক করা ছিল বলে পুলিশ দাবি করেছে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে একটি ভারতীয় আধার কার্ডও পাওয়া যায়।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘ডেভিড ইমন যখন দেখে তার ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে বা বেশি আলোচিত হয়ে গেছে, তখন সে বিদেশে থাকা গ্যাং লিডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাঁর পরামর্শে ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে বলে আমরা জানতে পারি।’
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ধাওয়া।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাওয়ার পথে কুমিল্লা জেলা পুলিশের সহায়তায় দাউদকান্দি এলাকায় প্রথমবার তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পুলিশ পৌঁছানোর আগেই ইমনরা ঢাকার দিকে চলে যান। ঢাকায় ঢোকার পর গাড়ি বদলে ফেলেন তাঁরা। এমনকি চালকও পরিবর্তন করা হয় বলে পুলিশ জানায়।
পরে খবর আসে, ইমন খুলনার দিকে যাচ্ছেন। তখন পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট বসায় পুলিশ। মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও ইমনকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ সুপার জানান, এরপর খুলনার রূপসা এলাকায় আরেকটি চেকপোস্ট বসানো হয়। কিন্তু ইমন আবারও পথ পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ হয়ে নড়াইলের দিকে চলে যান। তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটা। নড়াইল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও পুলিশ তাঁর গতিবিধির ওপর নজর রাখে।
শেষ পর্যন্ত যশোর জেলা পুলিশের সহায়তায় ২৯ জুলাই ভোর ৫টা থেকে সোয়া ৫টার মধ্যে যশোর কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন মো. শামীম, আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল এবং মো. সাফায়েত হোসেন। পুলিশের দাবি, তাঁরা সবাই ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সক্রিয় ছিলেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘ডেভিড ইমন ও তিনজন—তারা সবাই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং শুটার। বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে তারা ওস্তাদ।’
ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ মোট ১৩টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও চট্টগ্রাম মহানগরের একাধিক হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াছের বিরুদ্ধে ২১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা মামলা ছাড়াও অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে অস্ত্রের তথ্য
পুলিশ সুপার জানান, ডেভিড ইমনসহ গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের ব্যবহৃত অস্ত্রের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ জুলাই রাত সাড়ে তিনটার দিকে ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর গ্রামের পাইট্রাল টিলাপাড়ায় মৃত আবুল হোসেনের একটি পরিত্যক্ত বসতবাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের অভিযান চলাকালে একই সময়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল পুলিশের আরেকটি দল। কিন্তু ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের খবর টেলিভিশনের স্ক্রলে প্রচার হওয়ার পর ওই অভিযানের তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যান বলে জানান পুলিশ সুপার।
মাসুদ আলম বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। ডেভিড ইমনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে। তাঁর মাধ্যমে অস্ত্রের উৎস, চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক, অর্থের জোগানদাতা এবং দেশের বাইরে থাকা সহযোগীদের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।