সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কম্বলের সংখ্যা কম দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় আসামিদের সুবিধা দিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আদালতে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য প্রতিবেদন দাখিলের অভিযোগও উঠেছে।
মামলার নথিপত্র, এসএমপি কমিশনারের চিঠি, আদালতের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি কেন্দ্র করে মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা মোগলাবাজার থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেনকে কৈফিয়ত তলব করেছে এসএমপি। আদালতের নির্দেশে আলামত যাচাইয়ে তার প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জব্দ ৫৬০, এজাহারে দেখানো ৪৩০
মোগলাবাজার থানার জিআর-০৫/২৬ নম্বর মামলার নথি অনুযায়ী, চোরাচালানবিরোধী অভিযানে একটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৫৬০ পিস ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, থানার ওসি মনির হোসেনের নির্দেশে মামলার এজাহারকারী এসআই প্রকৃত সংখ্যা গোপন করে জব্দ তালিকায় মাত্র ৪৩০ পিস কম্বল দেখান।
এ ছাড়া জব্দ করা কম্বলগুলো এক স্তরবিশিষ্ট (সিঙ্গেল পার্ট) নাকি দুই স্তরবিশিষ্ট (ডাবল পার্ট), সেটিও জব্দ তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি ১৩০ পিস কম্বল এজাহার ও জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে দামি ডাবল পার্টের কম্বলকে অপেক্ষাকৃত কম দামের কম্বল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
পুরোনো নিলামের কম্বল দেখানোর চেষ্টা
মামলার নথিতে দেখা যায়, এর আগে সিলেট শাহপরান থানার জিআর-২৬৫/২৫ নম্বর মামলায় মো. কামরুল হাসান নামে এক ব্যক্তি আদালতের নিলাম থেকে ৬৫৮ পিস সিঙ্গেল পার্ট কম্বল কিনেছিলেন। পরে তিনি আরমান হুদা নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২২৮ পিস এবং মো. সেলিম আহমদের কাছে ৪৩০ পিস কম্বল বিক্রি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে মোগলাবাজার থানায় জব্দ করা ৪৩০ পিস কম্বলকে ওই পুরোনো নিলামের কম্বল হিসেবে দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে সেলিম আহমদের জিম্মায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে করে মোগলাবাজার থানায় জব্দ করা দামি ডাবল পার্টের কম্বল সুবিধাজনকভাবে বের করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তার ‘মনগড়া’ প্রতিবেদন
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
আদালত আলামতের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলেও অভিযোগ রয়েছে, তোবারক হোসেন থানায় সংরক্ষিত কাভার্ডভ্যানের কম্বল সরেজমিনে গণনা বা গুণগত মান যাচাই না করেই চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
ওই প্রতিবেদনে নিলামগ্রহীতা ও ক্রেতাদের কাগজপত্রের ভিত্তিতে জব্দকৃত কম্বলকে শাহপরান থানার নিলামকৃত কম্বল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে মামলার এজাহারের তথ্যের অসঙ্গতি নজরে আসে আদালতের। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আদালত নতুন করে আলামতের সংখ্যা ও গুণগত মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নেন।
আদালতের তদন্তে ৫৬০ পিসই পাওয়া যায়
২৩ ফেব্রুয়ারি আদালত একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আদালতের নাজির আজাদ মিয়ার নেতৃত্বে বেঞ্চ সহকারী মিজানুর রহমান, অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম ও জিআরএ শাখার একজন উপপরিদর্শকসহ তদন্ত দল মোগলাবাজার থানা কম্পাউন্ডে যায়।
তদন্ত দল থানায় তালাবদ্ধ ও সিলগালা অবস্থায় থাকা নীল-হলুদ রঙের কাভার্ডভ্যানটি (ঢাকা-মেট্রো-টি-১৮২৬২৯) তল্লাশি করে ৫৬০ পিস কম্বল গণনা করে। এসব কম্বল ‘নিউ জান্নাত’, ‘এনরোস চেরি’, ‘জিন্দাল ব্ল্যাংকেটস কিং’, ‘রয়েল গোল্ড’ ও ‘গোল্ড’ ব্র্যান্ডের প্যাকেটে ছিল।
অর্থাৎ, জব্দের সময় প্রকৃতপক্ষে ৫৬০ পিস কম্বল থাকার তথ্য আদালতের তদন্তে উঠে আসে, যা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ৪৩০ পিসের সঙ্গে সরাসরি অসঙ্গতিপূর্ণ।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি
ঘটনার পর ৯ মার্চ কাজী তোবারক হোসেনকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
শুনানিতে বিচারক জানতে চান, তদন্ত কর্মকর্তা নিজে থানায় গিয়ে জব্দ করা আলামত যাচাই করেছিলেন কি না। জবাবে তোবারক হোসেন স্বীকার করেন, তিনি নিজে আলামত দেখেননি এবং অন্য একজনের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।
পরে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে আদালত তার আবেদন নাকচ করে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বিষয়টি জানিয়ে এসএমপি কমিশনারকে চিঠি পাঠান।
কমিশনারের চিঠিতে ‘ওসির মদদ ও নির্দেশের’ উল্লেখ
পরে এসএমপি কমিশনার কাজী তোবারক হোসেনকে কৈফিয়ত তলব করেন। ওই চিঠিতে তার কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাবিরোধী, অপেশাদার, অদক্ষতা, নৈতিক স্খলন, গাফিলতি ও অসদাচরণের শামিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রথম শ্রেণির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও তার এ ধরনের কার্যক্রম চোরাকারবারিদের সহায়তা করার প্রবণতা প্রকাশ করে এবং এতে বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, কমিশনারের চিঠিতে একাধিকবার মোগলাবাজার থানার ওসি মনির হোসেনের মদদ ও নির্দেশে কম্বল সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
গাড়ি থেকে কম্বল সরানোর ছবি
স্টেট ট্রিবিউনের হাতে থাকা একাধিক ছবিতে দেখা যায়, থানার তৎকালীন ওসির গাড়িচালক কনস্টেবল মো. শাখাওয়াত হোসেন জব্দ করা কাভার্ডভ্যান থেকে কম্বল বের করে নিচ্ছেন। ছবিতে বিভিন্ন রঙের একাধিক কম্বল গাড়ির বাইরে নামিয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায়।
এ বিষয়ে শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঘটনার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং এখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না।
এর আগেও জব্দ করা মাল চুরির অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মো. মনির হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সিলেটের শাহপরান থানার ওসি ছিলেন। সে সময়ও তার বিরুদ্ধে জব্দ করা মালামাল চুরির অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের পর তাকে শাহপরান থানা থেকে ক্লোজ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অস্বীকার ওসির
অভিযোগের বিষয়ে মোগলাবাজার থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছিলেন এবং সব কম্বল থানার হেফাজতেই ছিল। পরে সেগুলো আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
এসএমপি কমিশনারের চিঠিতে বারবার তার মদদ ও নির্দেশে কম্বল চুরির কথা উল্লেখ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কেউ কারও বিরুদ্ধে লিখলে তো আর কম লিখে না। তাই তিনি লিখেছেন।”
‘প্রমাণ পেলে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা’
এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, তিনি ওসি মনির হোসেনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
তিনি বলেন, পুলিশের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রথমে বিভাগীয় এবং পরে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনজীবী ও টিআইবির বক্তব্য
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, কোনো ওসির বিরুদ্ধে জব্দ করা মাল আত্মসাতের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় পদের গুরুতর অবমাননার বিষয়। এ ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে কম্বল আত্মসাতের অভিযোগ গুরুতর দুর্নীতির বিষয়। তার মতে, দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি জালিয়াতি, আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।
তবে অভিযোগের মূল লক্ষ্য মোগলাবাজার থানার ওসি মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে জব্দকৃত আলামতের সংখ্যা কম দেখানো, তদন্তে হস্তক্ষেপ এবং আদালতে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগের পেছনে কারা জড়িত—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট হয়নি।