দক্ষিণ পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে সেই দেশের স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। মোজাম্বিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ফলাফল নিয়ে সহিংসতায় দেশটিতে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। গত ২৩ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তার পরপরই বিরোধী দলের সমর্থকরা আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। সহিংসতা-তান্ডবের পাশাপাশি শুরু করে প্রবাসীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে লুটপাট।
মোজাম্বিকের বিভিন্ন শহরে ২৩ ডিসেম্বর বিকাল থেকে বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট শুরু হয়। সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে মাপুতো, জাম্বেজিয়া, বেইরা এবং নামপুলা প্রদেশে। মোজাম্বিকের রাজধানী মাপুতো শহরে অধিকাংশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিয়েছে স্থানীয়রা। মাপুতো প্রদেশে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাটের শিকার হয়। ব্যবসায়ীরা জানান একেকটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কোটি মোজাম্বিক মেটিকেলের (মোজাম্বিক মুদ্রা) উপরে মালামাল লুট হয়েছে। লুট হওয়া বেশিরভাগই বড় সুপার শপ।
জাম্বেজিয়া প্রদেশের মধ্যে লুটপাট হয় নিকোডালা, নামাকুরা, মোকুবা, মুরুমবালা, মুলিভালা, মুকেবালা, মুলোমবো, আলতো মুলোক শহরে।
জাম্বেজিয়া প্রদেশে আলতোমুলোক শহরে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে। আলতো মুলুক শহরে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই লুটপাট হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, চীনসহ সব বিদেশিদের দোকানপাট আক্রান্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করার পাশাপাশি জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের সংবাদও পাওয়া গেছে। অনেক বাংলাদেশি শহর ছেড়ে পালিয়ে গভীর জঙ্গলে অবস্থান নিয়েছে। পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। আলতে মুলুক শহরে ৩৩টি বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গুদাম এবং বাসাবাড়িতে লুটপাট করা হয়েছে। যার মূল্যমান মোজাম্বিক মুদ্রায় এক হাজার কোটি মেটিকেল (মোজাম্বিক মুদ্রা)।
নামপুলা প্রদেশ এবং সুফলা বেইরা প্রদেশ হলো মোজাম্বিকের বাণিজ্যিক শহর। এই দুই প্রদেশের প্রতিটি শহরে এবং গ্রামে বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও লুটপাট চালানো হয়েছে।মোজাম্বিকে ১১টি প্রদেশের প্রায় সব জায়গাতেই বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাসাবাড়িতে লুটপাটের তথ্য পাওয়া গেছে। ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত লুটপাট, জ্বালাও পোড়াও সহিংসতা বেশি চলছে। তবে এখনও কিছু যায়গায় চলমান আছে। এসব সহিংসতা লুটপাট দমনে মোজাম্বিক সরকার নিরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ এবং সেনাবাহিনী লুটপাটে সহযোগীতা করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
৫০ বছরেও এমন সহিংসতার ঘটনা মোজাম্বিকে ঘটেনি বলে জানান স্থানীয়রা। পুরো দেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রবাসী এবং নাগরিকরা।
মোজাম্বিকে আন্দোলনের নামে লুটপাতে এপর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাংচুর হয়েছে। লুটপাটের ক্ষতির পরিমান আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি মেটিকেলের (মোজাম্বিক মুদ্রা) উপরে।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাড় করিয়েছেন। এমন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হবে কখনো কল্পনাও করেনি। সবকিছু নিমিষেই শেষ। তারা আরও জানান, ৭০ শতাংশ বাংলাদেশির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট করে নিয়ে গেছে। বাকি ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী ভয় আর উৎকণ্ঠায় মধ্যে দিন পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
উল্লেখ, গত ২৪ অক্টোবর থেকেই মোজাম্বিকে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর আগে ১২ অক্টোবর মোজাম্বিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ অক্টোবর সরকারী দলের প্রার্থী ড্যানিয়েল চ্যাপোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভেনানসিও মন্ডলেন ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে নির্বাচন কমিশন জানান। বিপরীতে ৭১ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ড্যানিয়েল চ্যাপো। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দলের প্রধান ভেনানসিও মন্ডলেন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার পরপরই বেশ কয়েকটি শহরে সহিংসতা বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুযোগেই শুরু হয় লুটপাট। ভেনানসিও মন্ডলেন বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং নির্বাচনের ফলাফল কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন এবং সেই ফলাফল বাদ দিয়ে নতুন করে ভোট গননার আহবান করে উচ্চ আদালতে মামলা করা হয় বিরোধী দলীয় নেতা ভেনানসিও মন্ডলেনের পক্ষ থেকে। তারপর থেকে বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সংহিসতা বিক্ষোভ ও লুটপাট চলতে থাকে। মোজাম্বিকে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ২৪ অক্টোবর থেকেই ভয় আর উৎকণ্ঠায় বসবাস করছেন।
গত ২৩ ডিসেম্বর ছিল নতুন করে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার তারিখ। মোজাম্বিকের নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশের বসবাসরত নাগরিকরা ২৩ ডিসেম্বর কি হতে যাচ্ছে সে নিয়ে উৎকন্ঠায় ছিল আগে থেকেই। বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকেও মোজাম্বিকে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল আগাম সহিংসতার বিষয়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নতুন করে মালমাল না তোলারও পরামর্শ দেয়া হয়েছিল বরে জানান কমিউনিটির নেতারা।