চট্টগ্রামের বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের দাবি, সময়মতো খাবার ও খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ দেওয়া হয়নি, শারীরিক অবস্থা বিবেচনা না করেই এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করানো হয়েছে এবং বিদেশসহ বিভিন্ন দেশের আট বিশেষজ্ঞের ‘অপারেশন না করার’ পরামর্শ উপেক্ষা করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পরও রোগীকে কেবিনে রাখা হয় এবং অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার পরও চিকিৎসক সময়মতো না আসায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
মৃত রোগীর নাম সুবিমল দাশ সুবীর (৩৫)। তিনি ‘থ্যালামিক গ্লাইওমা’ নামের এক ধরনের মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর চার বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। দেড় বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে তাঁর। স্ত্রী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
রোগীর ভাই চিকিৎসক আবীর দাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে চিকিৎসার শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে এসব অভিযোগ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২০ জুলাই রেডিয়েশন থেরাপির জন্য সুবিমলকে এভারকেয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিকেল ৩টার দিকে তাঁকে কেবিনে নেওয়া হয়।
ভর্তি হওয়ার পরই ফিডিং নিয়ে অভিযোগ
ডা. আবীর দাশের দাবি, কেবিনে নেওয়ার পরপরই তাঁরা দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সকে জানান, রোগী দুপুর ১২টার পর আর কোনো ফিডিং পাননি। দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করতে বললেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় চলে যায়।
তাঁর অভিযোগ, প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় প্রথম ফিডিং দেওয়া হয়। সেটিও ছিল মাত্র ২০০ মিলিলিটার ডাবের পানি।
খিঁচুনির ওষুধ সময়মতো না দেওয়ার অভিযোগ
পরিবারের দাবি, সুবিমল নিয়মিত সন্ধ্যা ৬টা ও রাত ৯টায় খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ নিতেন। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার নির্ধারিত ওষুধ সময়মতো দেওয়া হয়নি।
ডা. আবীর দাশ বলেন, পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে বাইরের ওষুধ দেওয়া যাবে না বলে জানানো হয়। তাঁর দাবি, সন্ধ্যার নির্ধারিত ডোজ না দিয়ে রাত ৯টার দিকে দুটি খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হয়। এরপর রোগী অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়েন।
এরপর হাসপাতালের পক্ষ থেকে এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করার কথা বলা হলেও সেদিন তিনি এতে সম্মতি দেননি বলে জানান ডা. আবীর।
এমআরআই ও অস্ত্রোপচার নিয়ে প্রশ্ন
পরদিন ২১ জুলাই সকালে নিউরোসার্জনসহ চারজন বিশেষজ্ঞ রোগীকে দেখেন। পরে এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডা. আবীরের দাবি, তিনি চিকিৎসকদের জানিয়েছিলেন, এর আগে তাঁর ভাইয়ের তিনটি এমআরআই ও ছয়টি সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থায় নতুন করে এমআরআই করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে চিকিৎসকেরা রোগীকে এ পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করেন।
পরিবারের দাবি, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের আটজন অধ্যাপক রোগীকে ‘নন-অপারেবল’ বা অস্ত্রোপচারের অনুপযোগী বলে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু এভারকেয়ার হাসপাতালের নিউরোসার্জন অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত দেন।
ডা. আবীর বলেন, ২১ জুলাই এমআরআই করার পর রাতে রোগীকে কেবিনে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে তাঁর উচ্চমাত্রার জ্বর শুরু হয়।
সকাল ৯টায় আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত, নেওয়া হয়নি বিকেল পর্যন্ত
পরিবারের অভিযোগ, ২২ জুলাই সকাল ৯টায় রেডিয়েশন বিভাগের চিকিৎসক ও আইসিইউ চিকিৎসক সুবিমলকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারও তাতে সম্মতি দেয়।
ডা. আবীরের দাবি, চিকিৎসা ও আইসিইউ ব্যয়ের জন্য হাসপাতালের হিসাবে আগেই অর্থ জমা রাখা হয়েছিল। তারপরও সকাল ৯টার সিদ্ধান্তের পরও তাঁকে বিকেল ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত কেবিনে রাখা হয়।
তিনি বলেন, দুপুর ২টার দিকে রোগীকে ফিডিং দেওয়া হয়। এর প্রায় ২০ মিনিট পর তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন দ্রুত কমে যায়। তখন তাঁর মা প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চিকিৎসকদের ডাকলেও কেউ কেবিনে আসেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দাবি, চিকিৎসকেরা কেবিনে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে যায় এবং বিকেল ২টা ৩৫ মিনিটে কেবিনেই সুবিমলের মৃত্যু হয়।
ডা. আবীরের আরও অভিযোগ, চিকিৎসাকালে প্রতি দুই ঘণ্টা পর রোগীর অবস্থান পরিবর্তন, টয়লেট পরিষ্কারসহ কিছু মৌলিক নার্সিং সেবাও নিয়মিত পাওয়া যায়নি।
পরিবারের অভিযোগ, ‘সম্মিলিত অব্যবস্থাপনার’ ফল
ডা. আবীর দাশ বলেন, ‘এটি আসলে একটি সম্মিলিত অব্যবস্থাপনার ফসল।’ তাঁর প্রশ্ন, সকাল ৯টায় আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও কেন বিকেল পর্যন্ত রোগীকে কেবিনে রাখা হলো।
তিনি বলেন, তাঁরা দুই ভাই চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও যদি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যায়।
তবে তিনি হাসপাতালের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা আইনি লড়াইয়ে যেতে চান না বলেও তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের অভিযোগ
ডা. আবীর দাশের পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন চিকিৎসকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি এভারকেয়ারে নিজেদের বা স্বজনদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাঁদের কেউ কেউ চিকিৎসায় অবহেলা, অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের কথা বলেছেন।
বক্তব্য পরে দেবে হাসপাতাল
অভিযোগের বিষয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রামের বক্তব্য জানতে হাসপাতালটির ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে তাদের বক্তব্য জানাবে।