দিনের ভোট রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার অভিযোগ ওঠে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ২০১৪ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্ধেকের বেশি আসন এবং ডামি প্রার্থীর মাধ্যমে বাকিগুলোয় নির্বাচন আয়োজন করা হয়। টানা চতুর্থ দফায় ক্ষমতা ধরে রাখতে শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালে করে ‘ডামি নির্বাচন’। তাতে ভোটের হার বাড়তি দেখানো, ভাড়া করা লোক দিয়ে ভোটারের উপস্থিতি দেখানো, গোপন কক্ষে আগন্তুকের প্রবেশসহ নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। আর এসব আড়াল করেই ঘোষণা হয় ভোটের ফল। নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের দিয়েই এসব করানোর অভিযোগ রয়েছে। আবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোনো কোনো কর্মকর্তা অতি উৎসাহী হয়েও নানা ঘটনা ঘটিয়েছেন। বিতর্কিত সেই পুরনোদের দিয়েই আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন।
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিতর্কিত তিন নির্বাচনে (দশম, একাদশ, দ্বাদশ) দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে নাগরিক সমাজ। বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। যদিও ইসিকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বহাল রেখে ইসির প্রস্তুতি সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করেন নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বলেছি পতিত সরকারের আমলে করা আইনে যেন নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া না হয়, কিন্তু সেটিই করা হয়েছে। বিগত সময়ে কারচুপির নির্বাচনে স্বৈরাচার সরকারকে যেসব কর্মকর্তা সহযোগিতা করেছেন তদন্ত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছি আমরা। এখনো বলছি এদের আগামী নির্বাচনে দায়িত্বে রাখা তো পরের কথা, তাদের যেন শাস্তির আওতায় আনা হয়। দুই-একটি রাজনৈতিক দলের কারণে বিগত সরকারের করা আইন মেনেই নির্বাচনের সবকিছু এগোচ্ছে, যার সঙ্গে আমরা একমত নই।’
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির মোট জনবলের বেশির ভাগই ২০১৮ ও ২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদেরও অনেকেই রয়েছেন। তাদেরই আগামী নির্বাচন পরিচালনায় রেখে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত সরকারের নির্বাচন কমিশন।
বদলির প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে ফরিদপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে। সারা দেশে এভাবেই চলছে অদল-বদল। এর মধ্যে দায়িত্ব নেয়ার পর বর্তমান কমিশন এক প্রজ্ঞাপনে ১৭ জনকে ইসি সচিবালয়ে এবং জেলা ও সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করে। আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ১৬ কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব, বিভিন্ন অঞ্চলে অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আরেক প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) একজন সহকারী পরিচালককে একই শাখার উপপরিচালক করা হয়েছে। এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি ও পদোন্নতি দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সর্বশেষ ১ জানুয়ারি ইসি সচিবালয়সহ মাঠ পর্যায়ের ৬২ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পদে পদায়ন ও বদলি করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বদলি-পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির জনবল ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপসচিব) খোরশেদ আলম বলেন, ‘এগুলো আমাদের নিয়মিত রুটিন কাজের অংশ। এখানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক বা সরকার থেকে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। আমরা কমিশনের বিধি অনুযায়ী বদলি, পদায়ন বা পদোন্নতি দেয়ার কাজ করছি। এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর কতজনকে বদলি বা পদোন্নতি দেয়া হয়েছে এটি হিসাব করে রাখা হয় না।’
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনে বর্তমান ইসি কর্মকর্তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় দাবি উঠলেও সেসব অভিযোগ আমলে নেয়া বা তদন্তের মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এএমএম নাসির উদ্দিনের কমিশন। উল্টো আসন্ন নির্বাচন প্রস্তুতির পুরোটাই চলছে বিগত তিন বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের নিয়েই। তবে বিভিন্ন স্তরে শূন্য পদে নতুন করে নিয়োগের কাজও করছে ইসি। বর্তমানে সারা দেশে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন স্তরে লোকবল রয়েছে ৫ হাজার ১১২ জন।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বিগত সরকারের চাপে কর্মকর্তাদের অনেক কিছু করতে হয়েছে। আবার অনেক অনিয়ম চোখের সামনে ঘটলেও তার প্রতিবাদ করতে পারেননি দায়িত্বশীলরা। সারা দেশের মানুষের মতো ইসি কর্মকর্তারাও ছিলেন বিগত সরকারের কাছে এক প্রকার জিম্মি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অবশ্য সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দল থেকে কোনো চাপ নেই। এ রকম পরিবেশ অব্যাহত থাকলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে মনে করেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও ছিল। এরই মধ্যে তারা বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে, দ্রুতই সেগুলো প্রতিবেদন আকারে সরকারের কাছে জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার। সাবেক তিনটি কমিশনের সিইসিসহ কমিশনারদের শাস্তির সুপারিশও করা হবে জানিয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাবেক তিনটি কমিশনের সিইসিসহ কমিশনারদের শাস্তির সুপারিশ করার কথা আমরা ভাবছি। এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কিন্তু কর্মকর্তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বর্তমান কমিশনকে। তাদের কাজ হচ্ছে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন করা। সেক্ষেত্রে তারা এসব কর্মকর্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
গণতান্ত্রিক যাত্রাকে উৎসবমুখর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এরই মধ্যে একটি সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে। নির্ভুল ভোটার তালিকা নিশ্চিত করতেও কাজ চলছে। তবে বিগত নির্বাচনগুলোয় দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের দিয়ে এসব কাজ করানো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, ‘বদলি, পদোন্নতি এগুলো চলমান প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকা যেমন চলমান, এগুলোও সে রকমই চলমান প্রক্রিয়া। বিগত নির্বাচন পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন তো কাউকে ছাঁটাই করে দেয়াও যাবে না। তবে এ বিষয়গুলো আমাদের সবার নলেজেই রয়েছে। এখানে সবাই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজটি হচ্ছে যখন যে সরকার আসে তার কাজটা করা। আওয়ামী লীগ এসেই ঘোষণা দিল ৪০ সাল পর্যন্ত একটা রোডম্যাপ। যখন সবাই দেখল এরা তো নামছে না তখন আর কী করবে, নিজেদের রক্ষা করার জন্য বিগত সরকার যেভাবে চেয়েছে সেভাবে কাজ করেছে। ওপর থেকে যা নির্দেশ গেছে তা-ই করতে হয়েছে।’
এসব কর্মকর্তা বহাল থাকায় আগামী নির্বাচনে কোনো শঙ্কার জায়গা থাকছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তাহমিদা আহমদ বলেন, ‘বর্তমানে যারা ক্ষমতায় রয়েছেন তারা তো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ না। ফলে এবার বিগত সময়ের মতো চাপ থাকবে না। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটি কোনো সমস্যা তৈরি করবে না।’