বাংলাদেশের দক্ষিণের শেষ সীমান্ত, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন—একটি স্থান, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন একদম আলাদা একটা ছন্দে বাঁধা। এখানে নদী আর সাগরের মাঝে ঘেরা, জীবনের প্রতিটি দিন যেন নতুন এক যুদ্ধ। এই সংগ্রামী অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি, যা প্রতিকূলতার মুখেও থেমে থাকে না। এই নিবন্ধে আমরা তুলে ধরছি সেই তিন তরুণের গল্প, যারা বয়সের বাধা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক দায়িত্ব আর জীবনযুদ্ধের মাঝেও হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো ফিরিয়ে এনেছেন।
তারা হলেন—জাহেদ হোসেইন (৪০), সহদেব দ্যা (৩০), ও মোহাম্মদ রাসেল (২৯)। প্রত্যেকে সাবরাংয়ের সন্তান, যাদের জীবন-সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প আজকের যুবসমাজের জন্য এক মহাবিপ্লব।
জাহেদ হোসেইন: দীর্ঘ অপেক্ষার পর আলো দেখার ইচ্ছা
জাহেদের গল্প শুরু হয় ২২ বছর আগে, যখন তিনি এসএসসি পরীক্ষায় দুইবার বসেছিলেন। কিন্তু গণিতের সমীকরণে হেরে যান বারবার। নিজের স্বপ্নে হার মানেননি, বরং পরিবারের আর্থিক দিক থেকে চাপের কারণে জীবিকার খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
বিদেশে এক দশক কাটানোর পর বুঝতে পারেন, অর্থ থাকলেই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার আলো ছাড়া জীবন অন্ধকারেই থেকে যায়। দেশে ফিরেন, সাবরাংয়ের একটি স্কুলে চালু হয় উন্মুক্ত শিক্ষার শাখা। খবর পেয়ে, জাহেদের মন প্রাণে আগুন জ্বলে ওঠে, “যা না পেয়েছিলাম একদিন, আজও কি পারবো না?”
রাত-দিন পরিশ্রমে, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ফিরে পেতে শুরু করেন আবার পড়াশোনা। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেন ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৪.২৮ জিপিএ। শুধুমাত্র সাফল্য নয়, ফিরে পেয়েছেন আত্মবিশ্বাসও। জাহেদের গল্প আমাদের শেখায়, সময় গেলে সব যায় না, ইচ্ছা থাকলে আবার ফিরে আসা যায়।
সহদেব দ্যা: ছোটবেলার স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার দোরগোড়ায়
সহদেব দ্যা’র শৈশব খুব সুখকর ছিল না। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেতেন খুব অল্প দিন। পরিবারের আর্থিক সমস্যা তাকে সাবরাংয়ের একটি সেলুনে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করেছিল। অনেক পরিশ্রমের পর নিজেই খুলে ফেলেন “নাইন স্টার” নামের একটি সেলুন, যেখানে আসতো স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সরকারি কর্মকর্তা সহ নানা পেশার মানুষ।
তাদের কথাবার্তা ও চোখে-মুখে অন্যরকম আলোর স্পর্শ সহদেবকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, “আমি কি পারি না?” উত্তর খুঁজতে রাত-দিন পরিশ্রম করে আবার ভর্তি হন উন্মুক্ত শিক্ষা কার্যক্রমে। দিনের বেলা দোকানে কাজ, রাতের বেলা বই পড়া—সহদেবের এই সংগ্রাম যেন স্বাধীনতার যুদ্ধ।
শেষ পর্যন্ত, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৮৬ নিয়ে পাশ করে প্রমাণ করেন, হারানো স্বপ্ন আবার ফিরে আসতে পারে যদি আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে জানি।
মোহাম্মদ রাসেল: অস্থিরতা থেকে স্থিরতার পথে
রাসেলের শৈশব কাটে স্কুলে পড়াশোনার মধ্যেই, তবে নিজের খামখেয়ালি ও অস্থিরতার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেন পঞ্চম শ্রেণির পর। পরিবারের চাওয়া সত্ত্বেও হারিয়ে যান ব্যবসার জগতে। সাবরাংয়ের বাজারে মোবাইল ব্যাংকিং এর দোকান শুরু করেন। ব্যবসা ভালো চললেও বুকের ভেতর একটুখানি আফসোস জমা থাকে, যখন স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের দেখে তার মন আচ্ছন্ন হয়।
একদিন নিজের কাছে প্রশ্ন করেন, “সময় কি একবার গেলে আর ফেরে না?” উত্তর খুঁজতে ফিরে আসেন পড়াশোনায়। কঠোর পরিশ্রম ও আত্মসংযমের মাধ্যমে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৬৪ অর্জন করেন। রাসেলের গল্প জানায়, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া যায়, যদি থাকে দৃঢ় ইচ্ছা ও মানসিক শক্তি।
শিক্ষা: শুধু ছোটবেলার বই পড়া নয়, দ্বিতীয়বার শুরু করাটাই বড় অর্জন
জাহেদ, সহদেব ও রাসেল—তিনজনেই কখনো ‘মেধাবী’ ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। কেউ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন না বা সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি। তবু তারা আজ এসএসসি পাস করে গর্বিত তরুণ।
তাদের গল্প শেখায়, শিক্ষা শুধুমাত্র শিশু বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয়বার শুরু করাটাই প্রকৃত বিজয়। জীবন নিজের মতো গড়ে তোলার সাহসই আসল শিক্ষা।
জীবন কখনো থেমে যায় না। থেমে গেলে থামা নয়, থেমে গিয়েও শুরু করা যায়। সাবরাংয়ের এই তিন তরুণ শুধু নাম নয়, সময়ের তিনটি শিক্ষার বাস্তব উদাহরণ। তারা মনে করিয়ে দেন, জীবন যদি দ্বিতীয় সুযোগ দেয়, তা গ্রহণ করতে হবে। হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফেরানোর নামই সাহসিকতা এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সম্ভব সাফল্যের আলো দেখা।
এই তিন সাহসী তরুণের গল্প আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, যে কোনো বাঁধা জয় করা যায় যদি আমাদের ইচ্ছা অটুট থাকে।