দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে পায়রা বন্দরে বদলি হলেও পদোন্নতির মাধ্যমে আবার চট্টগ্রাম বন্দরে ফেরার চেষ্টা করছেন ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলম। ডেপুটি কনজারভেটর (মেরিন) পদে থাকা এই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতির আবেদন করেছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) সাখাওয়াত হোসেনের কাছে। অথচ দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, দরপত্র কারসাজি, অতিমূল্যে জাহাজ মেরামত, ঘুষ লেনদেন এবং বন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তিনি দুদকসহ বিভিন্ন তদন্তের আওতায় আসেন এবং শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
যত অভিযোগ ক্যাপ্টেন ফরিদের বিরুদ্ধে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মেরিন বিভাগের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ভিটিএমএস) প্রকল্প ও জাহাজ মেরামত কার্যক্রমে অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিধি বিস্তৃত—প্রকল্প পরিকল্পনা থেকে শুরু করে দরপত্র, যন্ত্রপাতি ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ, জাহাজ মেরামত বিল, এমনকি বন্দর অবকাঠামোর নিরাপত্তা পর্যন্ত।
সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সালে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম মেসার্স জাহানারা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে মাতারবাড়ি বন্দর ও নির্মাণাধীন বে-টার্মিনাল প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করেন। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল রাডার, টেলিভিশন, কম্পিউটার, সিসিটিভি, এআইএস, জিএমডিএসএসসহ বিভিন্ন কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট। অভিযোগ রয়েছে, যন্ত্রপাতিগুলো ৫–৬ বছরের কার্যকাল বিবেচনায় ক্রয় করা হলেও প্রকল্প দুটিতে ভিটিএমএস কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। ফলে প্রকল্পে ভিটিএমএস কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই এসব যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে জাহানারা ট্রেডিংয়ের পক্ষ থেকে বন্দরের অভ্যন্তরে স্থাপিত ডিটিএমএস টাওয়ারের ছয় বছরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২৬০ কোটি টাকা প্রদর্শন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থা (আইএমও) রেগুলেশন অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরে ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নিয়ম মেনে প্রক্রিয়া শুরু করতে গেলে তা একপর্যায়ে আটকে যায়। পরে ২০১১ সালের ২৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এবং ২০১২ সালের ১৫ মার্চ দরপত্র খোলা হয়। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ৪৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় হল্যান্ড ইনস্টিটিউট অব ট্রাফিক টেকনোলজি (এইচআইটিটি) কার্যাদেশ পায়, যেখানে স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করে মেসার্স জাহানারা ট্রেডিং এন্ড কোম্পানি। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
কাজের অগ্রগতি ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বন্দরের তৎকালীন সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি টিম সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে পূর্তকাজ তদারকির জন্য কোনো প্রকৌশলী না রাখা, প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ না করা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর টাওয়ার স্থাপনের মতো অনিয়মের প্রমাণ পায়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে টাওয়ার নির্মাণ করে তা বিদেশি হিসেবে দেখানো, মূল সরবরাহকারীর পরিবর্তে সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানি থেকে যন্ত্রপাতি আনা এবং চুক্তির বাইরে বন্দরের শুল্ক-করের অর্থে অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কেনাসহ নানা অনিয়ম ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত হয়। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম এসব অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থাকলেও তা গোপন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে অনুমোদিত ডিপিপির সংস্থান লঙ্ঘন ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের তদারিক ছাড়াই কাজ করানোর অভিযোগে তাঁকে কারণ দর্শানোর সুপারিশ করা হয়।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। ২০১৯ ও ২০২২ সালে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে ইসিআরভি জাহাজের মেরামত যেখানে ৬৫ লাখ টাকায় সম্পন্ন হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালের ৩ জুন একই কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেইনবো ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন দুই দফা বিলে ৫ কোটি ৯২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৯৫ টাকা উত্তোলন করে। অথচ বিল পরিশোধের সময় জাহাজটি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডক ইয়ার্ডেই ছিল। নিয়ম অনুযায়ী জাহাজ নদীতে নামিয়ে কাজ সন্তোষজনকভাবে শেষ হওয়ার পর বিল পরিশোধের কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাজটির ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আগেই টেন্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করে মজুত রাখা হলেও নতুন করে ওভারহোলিংয়ের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের ৯ জুন শাহ আমানত ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের সহযোগিতায় সার্ভিস জেটিতে রাবার ফেন্ডার স্থাপন এবং জলপরী জাহাজের জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ বাবদ যথাক্রমে ৬ কোটি ২০ লাখ ৪০ হাজার ও ৫ কোটি ৮০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা উত্তোলন করে, যা প্রয়োজনীয় ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের ঘনিষ্ঠ এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সিকে একটি পন্টুন তৈরির কাজ দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। যেখানে একটি পন্টুন নির্মাণে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা, সেখানে ৬ কোটি ৪২ লাখ টাকার বিল দেখানো হয়। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে টাগবোট কান্ডারী-১২ ও এমভি ফোয়ারা জাহাজের ওভারহোলিং নিয়েও।
বন্দর সূত্র জানায়, টাগবোট কান্ডারী-১-এর মেরামতের জন্য ৪ কোটি টাকার বিল উপস্থাপন করা হলে তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং যাচাইয়ের দায়িত্ব দেন যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানকে। তিনি জানান, কাজটি ৬০ লাখ টাকায় করা সম্ভব। একইভাবে কান্ডারী-৭ জাহাজের জন্য দাবিকৃত ৫০ লাখ টাকার কাজ ১৫ লাখ টাকায় সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মত দেন তিনি।
২০২৪ সালের ১০ জুন বন্দর এলাকার একটি ডক অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও তদন্তের আওতায় আসে। ভবনটির বিদ্যুতায়নের কাজ বিদ্যুৎ বিভাগের পরিবর্তে মেরিন বিভাগের মাধ্যমে করানো হয়েছিল বলে জানা যায়, যেখানে নিম্নমানের ক্যাবল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
সবশেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মাহি এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া কার্যাদেশের মাত্র আট দিনের মধ্যে কয়েক কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল অনুমোদনের চেষ্টা করা হলে বন্দর চেয়ারম্যান প্রশ্ন তুলে বিল আটকে দেন। তদন্তে উঠে আসে অনিয়মের নতুন চিত্র।
এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৭ এপ্রিল ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমকে অন্যত্র বদলির সুপারিশসহ চার পাতার তদন্ত প্রতিবেদন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর আগেও ১৮ এপ্রিল পাঠানো চিঠিতে তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক চাপ প্রয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়।
২০২০ সালে দুদকও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে দরপত্রের মূল্য বাড়িয়ে শত কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।
এছাড়াও ২০১৩ সালে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার থাকাকালে এমভি গ্লাডিস নামক একটি জাহাজ মিয়ানমার উপকূলে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে বিকল হয়। এরপর ২০১৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আগমন করে। দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ায় মিয়ানমার নৌ বাহিনী শক্তিশালী টাগবোটের সহায়তা ব্যতীত জাহাজটি বন্দরের জেটিতে বার্থিং প্রদান হতে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বন্দর চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে নিজের একক সিদ্ধান্তে বিকল জাহাজটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জেটিতে ভেড়ানোর চেষ্টা করলে জাহাজটি পুনরায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়।
বন্দর চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে নিজের একক সিদ্ধান্তে বিকল জাহাজ ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ বন্দর জেটিতে ভেড়ানোর চেষ্টায় বন্দরকে বিপদের মুখে ফেলার অভিযোগে হারবার মাস্টার থাকাকালে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।
ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের পক্ষে একাট্টা বিএমএমওএ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলমের পক্ষে সংগঠিত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স এসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)। সংগঠনটির উদ্যোগে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর সরকারি বিভিন্ন পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সদস্যদের অপসারণের দাবিতে ৩০ থেকে ৪০ জনের উপস্থিতিতে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বৈঠকে বিএমএমওএর সভাপতি ক্যাপ্টেন (মেরিন) মো. এনাম চৌধুরী বলেন, ১/১১–পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমীসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামরিকীকরণের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে মার্চেন্ট মেরিনাররা তাদের প্রাপ্য পদোন্নতি ও সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, এই পরিস্থিতির কারণে মেরিন সেক্টরে নতুন জনবলের আগমন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি দেশের সব মেরিনারকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির আহ্বানে বৈঠকে উপস্থিত মেরিন কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রেস ব্রিফিং, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য কমিটি গঠন, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নির্বাচন এবং মিডিয়া উইং গঠনের প্রস্তাব উঠে আসে।
বৈঠকে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলম। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সাখাওয়াত হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় মার্চেন্ট মেরিনারদের দাবিদাওয়া পূরণে তাঁর কাছ থেকে আশানুরূপ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর এই সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ অবস্থায় সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম আরও বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সামরিকীকরণের প্রবণতায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তিনি মেরিন সেক্টর রক্ষায় যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা দেন।
এর পরদিন ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স এসোসিয়েশন পাঁচ দফা দাবি তুলে সংবাদ সম্মেলন করে। দাবিগুলোর মধ্যে চতুর্থ দফায় বলা হয়—চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতির যোগ্য উপযুক্ত প্রার্থীকে পদোন্নতি দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দাবির মাধ্যমে সংগঠনটি কার্যত ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলমকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতির ইঙ্গিত দেয়। এ সময় দাবি আদায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
পদোন্নতি নিয়ে ফিরতে চান চট্টগ্রাম বন্দরে
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই পদোন্নতির মাধ্যমে আবার বন্দরে ফেরার উদ্যোগ নেন ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলম। গত বছরের ২৯ অক্টোবর তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সাখাওয়াত হোসেনের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতির আবেদন করেন।
আবেদনে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার বিস্তারিত তুলে ধরে ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম নিজেকে উক্ত পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য দাবি করেন। বর্তমানে ডেপুটি কনজারভেটর (উপ-সংরক্ষক) পদে থাকা এই কর্মকর্তা আবেদনপত্রে স্পষ্টভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) পদে পদোন্নতি প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করেন।
চিঠিতে তিনি দাবি করেন, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদে পদোন্নতির জন্য উপযুক্ত। পদোন্নতি পেলে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং বন্দরের আন্তর্জাতিক মান উন্নয়নে নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারবেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করেন।
ক্যাপ্টেন ফরিদকে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করা হলেও ক্যাপ্টেন (মেরিন) ফরিদুল আলমকে নিয়ে এখনো বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে পায়রা বন্দরে যোগ দেওয়ার পরও তিনি বন্দরকেন্দ্রিক নানা বিষয়ে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধা আদায় করে দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দুই দফা গোপনীয় চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ এপ্রিল ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমকে পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। বদলি আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে পায়রা বন্দরে সংযুক্ত করা হলো।
বদলির পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন বিভাগে আন্তঃবদলি করে। বন্দর সূত্র জানায়, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রথম গোপনীয় চিঠিটি পাঠানো হয় গত ১৮ মার্চ এবং দ্বিতীয় চিঠিটি পাঠানো হয় ২৭ এপ্রিল নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে। ওই চিঠিগুলোর ভিত্তিতেই তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা। জানা গেছে, ১৮ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ওই চিঠি পাঠান।
চিঠি ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুকের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
পদোন্নতির আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে বর্তমানে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) পদে কর্মরত ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।