ঠাকুরগাঁওয়ের একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন বিটুমিন না পাওয়ার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত এলজিআরডি মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, বারবার যোগাযোগ করেও বিটুমিন না পেয়ে তারা মন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। পরে বিটুমিন সরবরাহ করা হলেও ঘটনাটি ঘিরে গ্রাহক হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (জেওসিএল) মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে গত এক বছরে বিটুমিন সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিপিসির প্রশিক্ষণ, সাবসিডিয়ারি প্রশাসন ও কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জারি করা এক তাগিদপত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত চিঠিটি যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরে বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
তাগিদপত্রে বলা হয়, মো. আবদুস সামাদ নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির দাখিল করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গত বছরের ৭ ডিসেম্বর যমুনা অয়েলে বিটুমিন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিটুমিন বরাদ্দ পায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ এলাকার এবং গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিটুমিনের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করেও বিটুমিন কমিটির কাছ থেকে কোনো কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৩ মে যমুনা অয়েলের এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে ৫ মে বিটুমিন সংগ্রহের আশায় ঠাকুরগাঁও থেকে চট্টগ্রামে যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে আসেন অভিযোগকারী প্রতিনিধি। সেখানে সারাদিন অপেক্ষা করার পর তাঁকে জানানো হয়, তাঁর সিরিয়াল নম্বর ৯৫ এবং ওই মুহূর্তে বিটুমিন দেওয়া সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
পরে উপায়ন্তর না পেয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এরপরও বিটুমিন সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মো. আবদুস সামাদ বলেন, “পে-অর্ডার জমা দেওয়ার ছয় মাস পার হলেও আমরা বিটুমিন পাইনি। অথচ সাধারণত এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই বিটুমিন পাওয়ার কথা।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিটুমিন সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। “একেক সময় একেক সিরিয়াল নম্বর বলা হয়েছে। কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় আমরা একাধিকবার যোগাযোগ করলেও বিটুমিন দেওয়া হয়নি,” বলেন তিনি।
মো. আবদুস সামাদ আরও বলেন, “দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও বিটুমিন না পাওয়ায় আমরা পে-অর্ডার ফেরত চাই। কিন্তু সেটিও ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বিষয়টি এলজিআরডি মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করা হয়।”
তবে ভিন্ন কথা বলছেন অভিযুক্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি এ ধরনের অভিযোগের মতো কোনো কাজ করিনি। পুরো বিটুমিন সরবরাহ প্রক্রিয়াটি অনলাইনভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও সিরিয়াল পরিবর্তন বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।”
তিনি বলেন, অভিযোগকারী যে ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন চেয়েছিলেন, সে সময় ইস্টার্ন রিফাইনারি শাটডাউনে থাকায় ওই গ্রেডের কোনো উৎপাদন ছিল না। ফলে তা সরবরাহের সুযোগও ছিল না। “রিফাইনারিতে খোঁজ নিলেই বিষয়টি জানা যাবে,” বলেন তিনি।
মো. মাসুদুল ইসলাম জানান, অভিযোগকারীর কার্যাদেশ মেয়াদোত্তীর্ণ থাকায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কার্যাদেশের সময় বৃদ্ধি করে আনার পরামর্শ দিলে তিনি দীর্ঘ চার মাস পরে তা জমা দেন। মূলত, দেরিতে কাগজপত্র জমা দেওয়ায় কারনেই তাঁর সিরিয়াল পিছিয়ে যায়। এটি অনলাইনের নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।
চট্টগ্রামে আসতে অভিযোগকারীকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলেননি বলেও দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
এছাড়া মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতিনিধি পরিচয়ে রোমান ইসলাম নামের একজন যোগাযোগ করে ইদুল আজহার আগে বিটুমিনের প্রয়োজন সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। তাকে বিটুমিন সরবরাহের ব্যাপারে আশ্বস্তও করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করে ৫ মে আবদুস সামাদ আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ না করেই চট্টগ্রাম এসে বিটুমিন চেয়ে বসেন। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন শুরু না হওয়ায় ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন দেয়ার সুযোগ ছিলো না। তখন তিনি ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেননি। ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বিটুমিন পাওয়া সাপেক্ষে তাকে পরের সপ্তাহে বিটুমিন সরবরাহের একটা আশ্বাস দেওয়া হয়। এছাড়া অভিযোগকারী কখনও লিখিতভাবে পে-অর্ডার ফেরত চাননি।
মন্ত্রী মহোদয়ের ফোন পাওয়ার পর পরদিনই অভিযোগকারীকে অন্য একটি গ্রেডের (৬০/৭০) বিটুমিন সরবরাহ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন মো. মাসুদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “এক গ্রেডের পরিবর্তে অন্য গ্রেডের বিটুমিন সরবরাহ করাও নিয়মের বাইরে। তারপরও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটি করা হয়েছে।”
নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও দাবি করেন মো. মাসুদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমি কোনো অন্যায় বা অনিয়ম করিনি। সরকার ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই কাজ করেছি। হয়তো আমাকে এখান থেকে সরানোর জন্য একটি পক্ষ অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমি আল্লাহর ওপর বিচার ছেড়ে দিয়েছি।”
এ বিষয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। বিপিসির তাগিদপত্র পাওয়ার পর মো. মাসুদুল ইসলামকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।”