দেশে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা এবং গুজব ছড়াতে দেখা যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এমন প্রবণতা রয়েছে। কারণ সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত সুরক্ষা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এ বাহিনীগুলোর ভূমিকা সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা যত বেশি জনআগ্রহ তৈরি করে, সেটিকে ঘিরে অপতথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও তত বাড়ে।
তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় গুজব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি পোস্ট, ভিডিও বা অডিও কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। অথচ সেই তথ্যটি সত্য কি না, সেটি যাচাই করার সুযোগ অনেকেই নেন না।
গবেষণায়ও দেখা গেছে, আবেগনির্ভর বা চাঞ্চল্যকর তথ্য অনেক সময় যাচাইকৃত তথ্যের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কোনো ঘটনার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসার আগেই নানা ধরনের ব্যাখ্যা সামাজিক মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
কেন সশস্ত্র বাহিনীকে লক্ষ্য করা হয়?
সশস্ত্র বাহিনীকে ঘিরে গুজব ছড়ানোর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হয়। কখনো সামাজিক মাধ্যমে বেশি প্রচার বা অনুসারী পাওয়ার জন্য অতিরঞ্জিত কিংবা ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্য, পুরোনো ছবি বা প্রসঙ্গবিহীন ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়।
নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনেক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এই তথ্যগত সীমাবদ্ধতার সুযোগেও নানা অনুমান ও গুজব ছড়াতে দেখা যায়।
তথ্য, মতামত ও গুজব এক নয়
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মতামত দেওয়া এক বিষয়, আর তথ্য উপস্থাপন করা আরেক বিষয়।
সাংবাদিকতায় একটি তথ্যকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সেটির পক্ষে যাচাইযোগ্য নথি, প্রত্যক্ষ সূত্র অথবা একাধিক বিশ্বাসযোগ্য উৎস থাকতে হয়।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো পোস্ট, ভিডিও, স্ক্রিনশট বা অডিও—এসবের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই না করা পর্যন্ত সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
গণতন্ত্রে সমালোচনার জায়গা আছে
রাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা বা জবাবদিহিতা দাবি করা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ।
তবে সমালোচনা এবং গুজব এক বিষয় নয়। তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ বা অপতথ্য বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
নাগরিকের দায়িত্ব কী?
ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব শুধু সাংবাদিক বা রাষ্ট্রের নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও।
কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
* তথ্যটির মূল উৎস কী?
* এটি কি সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে?
* দাবিটির পক্ষে কী যাচাইযোগ্য প্রমাণ রয়েছে?
* ছবিটি বা ভিডিওটি বর্তমান ঘটনার, নাকি পুরোনো?
এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না মিললে তথ্যটি শেয়ার না করাই দায়িত্বশীল আচরণ।
আস্থা গড়ে ওঠে তথ্যের ওপর
সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে জনআগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেই আগ্রহের সুযোগে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অপতথ্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রকৃত তথ্যকে আড়াল করতে পারে।
তাই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে; কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত তথ্য, নথি এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে আস্থা গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা ও তথ্যের ওপর—গুজবের ওপর নয়।