মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন

বিদ্যুৎ খাতে তিন বছরের লোকসানে নির্মাণ করা যেত চারটি পদ্মা সেতু !

নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০ নভেম্বর ২০২৪

চাহিদা বিবেচনা না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এতে গত জুন শেষে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে ২৭ হাজার মেগাওয়াট। যদিও উৎপাদন করা হয় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। শীতে তা নেমে যায় আট থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াটে। আবার জ্বালানি সংকটে গ্রীষ্মেও চাহিদার পুরোটা পূরণ করা সম্ভব হয়নি হাসিনার শেষ দুই বছরে। এরপরও নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বোঝা টানতে গিয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়।

ব্যয়ের বোঝা বাড়তে থাকায় ঘনঘন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেও ঘাটতি মেটানো যায়নি। এতে লোকসানের পাল্লা ভারী হয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। ভর্তুকির পরিমাণও বৃদ্ধি করতে হয়েছে। এর মধ্যে হাসিনার ক্ষমতার শেষ তিন অর্থবছরেই (২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪) পিডিবি লোকসান গুনেছে প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এ ব্যয় চারটি পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যয়ের চেয়েও বেশি।

লোকসানের ঘাটতি পূরণে সরকার এ তিন বছরে ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় এক লাখ সাত হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। অথচ ২০০৮-০৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত আগের ১৩ বছরে পিডিবি লোকসান গুনেছে ৭৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। আর সে সময় ভর্তুকি ও বাজেট সহায়তা বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৬৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এ থেকেই বোঝা যায় বিদ্যুৎ খাতের শেষ তিন বছরের চিত্র।

পিডিবির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ সময় পিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এটি ছিল পিডিবির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোকসান ও ভর্তুকি। এর আগের অর্থবছর (২০২২-২৩) বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ও ভর্তুকির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়। ওই অর্থবছর পিডিবি লোকসান করেছিল ৫১ হাজার ৩০০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল ৩৯ হাজার ৫৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

এদিকে ২০২১-২২ অর্থবছর পিডিবি লোকসান গুনেছিল ৩২ হাজার ৮৯১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সে অর্থবছর ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ৬৫৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এটি পিডিবির ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ লোকসান ও ভর্তুকির পরিমাণ। মূলত হাসিনার ক্ষমতার শেষ তিন অর্থবছরে দেশে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসতে শুরু করে। আদানির কারণে ভারত থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গত তিন অর্থবছরে ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ১১৮ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারের বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করায় গত তিন অর্থবছরে এ খাতেও ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত তিন অর্থবছর শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই দিতে হয়েছে ৬০ হাজার ১৮৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরই ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৬৯৪ কোটি সাত লাখ টাকা। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছর এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ১৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছর ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেষ অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জ খাতেই ব্যয় বেড়েছে ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০২১ সালের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও কয়লার দাম বাড়তে শুরু করে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। গত বছর মাঝামাঝি সময়ে এসে তা আবার কিছুটা নিম্নমুখী হলেও নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বেড়েছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার।

এতে পাঁচ বছর আগেও যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল ছয় টাকার কম, তা বর্তমানে বেড়ে ১১ টাকায় ঠেকেছে। গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ছিল ১১ টাকা দুই পয়সা, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০২২-২৩ অর্থবছর এ ব্যয় ছিল সর্বোচ্চ ১১ টাকা ১৪ পয়সা। লোকসানের চাপ সামাল দিতে গত বছর জানুয়ারি থেকে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৪ মাসে চার দফা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাইকারি বিদ্যুতের দামও বেড়েছে দুই দফা। এরপও রেকর্ড লোকসান হয়।

পিডিবির তথ্যমতে, তিন অর্থবছর আগেও বিদ্যুৎ খাতের এ ধরনের চিত্র ছিল না। ২০২০-২১ অর্থবছর পিডিবির লোকসান হয়েছিল ১১ হাজার ৬৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সে অর্থবছর সংস্থাটিকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল ১১ হাজার ৭৭৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তার আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল আরও অনেক কম। ওই (২০২০-২১) অর্থবছর পিডিবির লোকসান হয়েছিল সাত হাজার ৪৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল সাত হাজার ৪৩৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এদিকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর পিডিবি লোকসান গুনেছিল মাত্র ৮২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পরের (২০০৯-১০) অর্থবছর তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তবে ২০১০-১১ অর্থবছর লোকসান এক লাফে সাতগুণের বেশি বেড়ে হয় চার হাজার ৬২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছর তা আরও ৪৪ শতাংশ বেড়ে হয় ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছর তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৪৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

পরের দুই অর্থবছর পিডিবির লোকসান আবারও বাড়ে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছর লোকসান ৩৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৮০৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছর প্রায় সাত শতাংশ বেড়ে হয় সাত হাজার ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পিডিবির লোকসান প্রায় ৪৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর পিডিবির লোকসান আবারও বাড়ে। ওই অর্থবছর লোকসান দাঁড়ায় চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছর পিডিবির লোকসান অনেকখানি বাড়ে। ওই অর্থবছর ১১০ শতাংশ বেড়ে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩১০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তবে পরের দুই অর্থবছর তা আবার কমে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছর লোকসান হয় আট হাজার ১৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর তা আরও কমেছিল। সংস্থাটির লোকসান প্রথম ১০ হাজার কোটি ছাড়ায় ২০২০-২১ অর্থবছর। যদিও পরের দুই অর্থবছরে তা ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

সর্বশেষ সংবাদ
ইলিয়াস আলী গুম-হত্যার অভিযোগে উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান হেফাজতে

ইলিয়াস আলী গুম-হত্যার অভিযোগে উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান হেফাজতে

একরাম হত্যা: সেনা হেফাজতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ

একরাম হত্যা: সেনা হেফাজতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ

দীঘিনালায় সরকারি আদেশ অমান্য করে ঋণের কিস্তি আদায়

দীঘিনালায় সরকারি আদেশ অমান্য করে ঋণের কিস্তি আদায়

বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত

বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: স্পিকারের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাৎ শিগগির

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: স্পিকারের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাৎ শিগগির

সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতিতে না প্রধানমন্ত্রীর

সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতিতে না প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তৈরি পোশাকের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্প হতে পারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত: প্রধানমন্ত্রী

তৈরি পোশাকের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্প হতে পারে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত: প্রধানমন্ত্রী

দলীয় ফোরামে ঠিক হবে নতুন রাষ্ট্রপতি: মির্জা ফখরুল

দলীয় ফোরামে ঠিক হবে নতুন রাষ্ট্রপতি: মির্জা ফখরুল

ভাঙা সড়কের গর্তে পড়ে লরির চাকায় মাথা পিষ্ট, নিহত মোটরসাইকেল চালক

ভাঙা সড়কের গর্তে পড়ে লরির চাকায় মাথা পিষ্ট, নিহত মোটরসাইকেল চালক